বাংলায় ভাস্কর্যের ইতিহাস কত প্রাচীন তা অনুমান করা যায় উয়ারী বটেশ্বরে পাওয়া নিদর্শন থেকে। অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এ অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতায়ও ভাস্কর্যের নির্মাণ ও ব্যবহার ছিল। কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতির উচ্চ ভূমিতে সপ্তম শতাব্দী ও পরবর্তী সময়ে পঞ্চাশের বেশি বৌদ্ধ ইমারত নির্মিত হয়েছে। খড়গ, চন্দ্র, বর্মণ ও পালদের আমলে রাজধানীকে কেন্দ্র করে বিকাশ ঘটেছিল ভাস্কর্য শিল্পের। বাংলায় ভাস্কর্যের গল্প সেই হাজার বছর আগে চলে যায়; তবে প্রাথমিক দিনগুলোয় ভাস্কর্য ছিল মূলত বৌদ্ধ প্রভাবিত; কতকটা জৈন নিদর্শনও পাওয়া যায়।
প্রাচীন বাংলায় ভাস্কর্য নির্মাণে সচরাচর ব্যবহার করা হয়েছে কাদামাটি। অবশ্য ধর্মীয় ইমারত এখন পর্যন্ত ইট দিয়ে নির্মিত হয়। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ ও একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গে বিভিন্ন আকৃতির প্রস্তরমূর্তির প্রচলন ছিল। মন্দিরে, খোলা স্থানে, গাছের নিচে কিংবা ব্যক্তিগত প্রার্থনালয়ে ভাস্কর্যগুলোর উপাসনা করা হতো। অষ্টম ও নবম শতাব্দীর দিকে বৌদ্ধ ভাস্কর্যের বেশ বড় সংগ্রহ পাওয়া গেছে ময়নামতি ও আশপাশের অঞ্চলে। পরবর্তী সময়ে আরো কিছু ভাস্কর্য আবিষ্কার হয়েছে মহাস্থানগড় ও বিক্রমপুরের মতো স্থানে। সেক্ষেত্রে ভাস্কর্যগুলো ধাতুতে ঢালাই করে নির্মিত। মহাস্থানগড় থেকে পাওয়া অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি সম্ভবত উত্তরবঙ্গে পাওয়া ঢালাইকৃত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। লালমাই-ময়নামতি পাহাড় ও সে অঞ্চলে পাওয়া প্রাচীনতম ঢালাইকৃত মূর্তি সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীতে তৈরি। বাংলায় তৈরি মূর্তি নালন্দা, কুর্কিহার, বিহার এমনকি যবদ্বীপেও পাওয়া গেছে; যা অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে এ অঞ্চরের প্রভাব বৃদ্ধির সাক্ষ্য বহন করে। বাংলায় ভাস্কর্য নির্মাণে প্রধান উৎস ছিল পোড়ামাটি। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত মোটামুটি পাটাতন তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তী শতকগুলোর মধ্যে পোড়ামাটির ব্যবহার অব্যাহত থাকে। বাংলার আবহাওয়া কাঠ দিয়ে স্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রে খুব একটা উপযোগী না। তার পরও স্থাপত্যে কিছুটা কাঠের ব্যবহার দেখা যায়।
পাল যুগে পাওয়া পাথর ও ধাতু শিল্পের বিষয়বস্তু দেব-দেবী। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত দেব-দেবীর ধ্যানের অনুসরণ করে নির্মিত। তবে শিল্পীর নৈপুণ্য ও সৌন্দর্যবোধের পরিচয় সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান। পাশাপাশি তৎকালীন ভাস্কর্যচর্চায় লোকায়ত ধারার ভাস্কর্য়ের প্রভাব ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা হয়। তাদের মাধ্যমে বাংলায় পারসিক, তুর্কি ও আরব শিল্পভাবনা প্রবেশ করে। বাংলায় মুসলিম শাসনামলে স্থাপত্য শিল্পের যে প্রভূত উন্নতি ঘটেছিল, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সুলতান ও মোগল আমলে নির্মিত স্থাপনা।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে প্রাচীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হয়। ফলে এখানকার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। ব্রিটিশ শাসকরা শাসনকার্যের অংশ হিসেবে পাশ্চাত্য শিল্প ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্যে ১৮৫৪ সালে কলকাতায় শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এ স্কুলে চিত্রকলা, খোদাইকর্ম, জরিপকাজ প্রভৃতি বিষয় শেখানো হলেও ভাস্কর্য শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবে উপনিবেশ শাসনামলে বেশ কয়েকজন ভাস্কর্যশিল্পী পরিচিতি লাভ করেন। তাদের মধ্যে ঢাকার রোহিনী কান্ত নাগ, বরিশালের শীতল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ময়মনসিংহের অশ্বিনী বর্মণ রায় এবং ঢাকার বিক্রমপুরের ফণীন্দ্রনাথ বসু প্রধান।
দেশ বিভাগের অব্যবহিত পরই বাঙালি মুসলমানদের একটা বড় অংশ কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। তাদের মধ্যে একদল শিল্পী ১৯৪৮ সালে ঢাকায় গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় শিল্পচর্চা শুরু হয় এবং আধুনিক ধারার শিল্প-আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ভাস্কর্য শিল্পচর্চা শুরু হতে সময় লেগেছে আরো কয়েক বছর। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নভেরা আহমেদের হাতে দেশে ভাস্কর্যচর্চার সূচনা হয়। তিনি প্যারিস, ভিয়েনা ও ফ্লোরেন্সে যান এবং সেখানকার ভাস্কর্যশিল্পীদের প্রত্যক্ষ সাহচর্য লাভ করেন। শৈলীগত দিক থেকে তিনি ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরি মুর দ্বারা অনুপ্রাণিত। ১৯৫৬-৬০ সালের মধ্যে তিনি ঢাকায় অসংখ্য ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ১৯৫৭ সালে হামিদুজ্জামান খানের সঙ্গে মিলে তিনি শহীদ মিনারের কাজ শুরু করেন; যদিও ১৯৬০ সালে দেশ ছেড়ে চলে যান।
১৯৬৩ সালে গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্ট রূপান্তরিত হয় কলেজে এবং ভাস্কর্য বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ১৯৬৪ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ভাস্কর্য শিক্ষার সূচনা ঘটে। তিনি বাংলাদেশে ভাস্কর্যচর্চাকে একটি আধুনিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বহিরাঙ্গন ভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গী তার কীর্তি। ১৯৭২ সালে তিনি বিমান বাহিনীর সদর দপ্তরের জন্য নির্মাণ করেন শাহীন ভাস্কর্যটি। ঠিক পরের বছর তৎকালীন ডাকসুর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু করেন ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা প্রভৃতিকে বিষয় করে স্মৃতি ’৭১ শিরোনামে হামিদুজ্জামান খান সিরিজ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ভাস্কর্য সিরিজটি দেশের ভাস্কর্যচর্চার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ভবন বঙ্গভবনে পাখি পরিবার নামে ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ভবনের সামনে নির্মাণ করেন সংশপ্তক। তার অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা, মিশুক, ইস্পাত, বিজয়কেতন ও কিংবদন্তি। অলোক রায়ের ভাস্কর্যে স্বাধীনতা, ভাষা, জাতীয়তা, গণতন্ত্রের সংগ্রাম প্রভৃতি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। মাটির কান্না, আবদ্ধ, শহীদ প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য কর্ম। বাংলাদেশের ভাস্কর্যচর্চায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন শামীম শিকদার। তার কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে স্বপার্জিত স্বাধীনতা, ফুলার রোডের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্ট্রাগলিং ফোর্স ও একটি মধুর স্বপ্ন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্য ভাস্করদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মো. এনামুল হক, মুজিবুর রহমান, রাসা সিদ্দিকী, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আক্তার জাহান আইভী, সুলতানুল ইসলাম, মো. তৌফিকুর রহমান, মৃণাল হক, মুকুল মুকসুদ্দিন, শ্যামল চৌধুরী, মাহবুব জামাল, লালা রুখ সেলিম, মোস্তফা শরীফ আনোয়ার, ময়নুল ইসলাম পল, নাসিমা হক মিতু, ইমরান হোসেন, কবীর আহমেদ মাসুম চিশতী, ঢালী আল মামুন, হাসানুর রহমান রিয়াজ, নাসিমুল খবির প্রমুখ।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনের স্মারক হিসেবে বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য। ভাস্কর্যগুলো আমাদের সব আন্দোলন আর সংগ্রামের ইতিহাসকে রেখেছে সমুন্নত। ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা ভাস্কর্যের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছে নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের স্মারক। শহীদ মিনার ভাস্কর্যটি বাংলা ভাষার এবং ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারী সব শহীদের স্মৃতিকে সব বাঙালির মনে স্থায়ী করেছে। সন্ত্রাসবাদবিরোধী চেতনাকে চিরন্তন করার প্রত্যয়ে ১৯৯২ সালে স্থাপন করা হয় রাজু ভাস্কর্য। নকশা প্রণয়ন করেন ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী এবং নির্মাণে সহায়তা করেন গোপাল পাল। ভাস্কর্যটি এখন দেশের সব ধরনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রতিবাদের কেন্দ্ররূপে রূপান্তর হয়েছে। এছাড়া ভাষা আন্দোলন ও ভাষাশহীদদের স্মরণে ১৯৯১ সালে শিল্পী জাহানারা পারভীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণ করেছেন অমর একুশ, ২০০৭ সালে ভাস্কর অখিল পাল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নির্মাণ করেছেন মোদের গরব এবং ঢাকার পরীবাগে শিল্পী মৃণাল হক নির্মাণ করেছেন জননী ও গর্বিত বর্ণমালা ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাবাশ বাংলাদেশ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের পাশে অবস্থিত ভাস্কর্যটির ভাস্কর নিতুন কুন্ডু। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণে নির্মিত আরেকটি ভাস্কর্য মুক্তবাংলা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ভাস্কর্যটির নির্মাতা রশিদ আহমেদ। জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে বিজয় ’৭১ ভাস্কর্যটি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ভাস্কর্যটির ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী।
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন ভাস্কর্য। ভাস্কর্যগুলো আমাদের সামনে অতীতের গৌরবময়তার ইতিহাসের নীরব ভাষ্য উপস্থাপন করে। বর্তমান সময়ে ভাস্কর্য অতিক্রম করছে নতুন বাঁক। চলছে বাংলার হাজার বছরের ভাস্কর্যচর্চার ঐতিহ্যে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করার প্রস্তুতি।