প্রদর্শনী

সহাবস্থানের স্থাপত্য: ‘মানুষবান্ধব’ গণপরিসরের আখ্যান

ড্যানিশ স্থাপত্যবিদ ইয়ান গেল একবার বলেছিলেন, ‘ফার্স্ট লাইফ, দেন স্পেসেস, দেন বিল্ডিংস। দ্য আদার ওয়ে অ্যারাউন্ড নেভার ওয়ার্কস’। এ উক্তি তার কর্মজীবনকে প্রতিফলিত করে। নগর পরিকল্পনা, স্থাপনা নির্মাণের কেন্দ্রে মানুষ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে তিনি বরাবর প্রাধান্য দিয়েছেন। বিল্ডিং নয়, বরং একটি বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংয়ের দূরত্ব (স্পেস) ও স্পেসের কাঠামোকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা এ স্পেসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি মানুষের জরুরি, ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। এসব ভাবনা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত ‘সহাবস্থানের স্থাপত্য: বঙ্গীয় ব-দ্বীপে জনপরিসরের স্থানিক আখ্যান’ শীর্ষক প্রদর্শনী।

বেঙ্গল শিল্পালয়ের লিফট থেকে বেরিয়ে লেভেল ফোরে গিয়ে দাঁড়াতেই নজর কাড়ে পোড়ামাটির টালি দিয়ে বানানো বিশাল এক ছাউনি। ভেতরে গিয়ে দেখা যায় ইট দিয়ে বানানো বসার জায়গা, পায়ের নিচে ইটের সুরকি বিছানো মেঝে। এসব উপকরণের পাশাপাশি প্রদর্শনীতে রয়েছে বাঁশ, কাঠ ও অন্যান্য স্থানীয় উপকরণে নির্মিত একাধিক শিল্পকর্ম। এছাড়া অনেক গণপরিসরের স্থাপত্যের নকশাও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।

গত ২৫ জুন শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে আগামীকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। ব্রিটিশ কাউন্সিল ‘উইমেন অফ দ্য ওয়াল্ডর্ বাংলাদেশ ২০২৬’ কর্তৃক কমিশনকৃত প্রদর্শনীটিতে স্থপতিযুগল সায়কা ইকবাল মেঘনা এবং শুভ্র শোভন চৌধুরীর ষোল বছরের চর্চাপ্রসূত স্থাপত্যচিন্তা ও চেতনার নির্যাসকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাদের শিল্পকর্মের আলোকচিত্রও প্রদর্শনীতে রয়েছে। যেমন স্থপতি মেঘনার নকশা করা আশুলিয়ায় অবস্থিত ‘জেবুন নেসা’ মসজিদের আলোকচিত্র ঝুলানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক চর্চার মেলবন্ধন বিবেচনায় নিয়ে নির্মিত এ মসজিদটি গতবছর টাইম ম্যাগাজিনের ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট প্লেসেস’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। প্রদর্শনীতে রয়েছে মন্দিরের ছবিও, যার ছাদ দিয়ে আলো এসে পড়ছে ভেতরে। এছাড়া রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও কলাভবনের সামনের ফোয়ারা, কাঠ দিয়ে নির্মিত বাড়িসহ আরো অন্যান্য স্থাপনার চিত্র। তবে এসব আলোকচিত্রের ‘ফোকাস’ মূলত মানুষ ও তাদের কার্যক্রম। অর্থাৎ যেভাবে গণপরিসর মানুষের সামাজিক কার্যকলাপের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

এর প্রেক্ষিতে প্রদর্শনীটি নিছক স্থাপত্য বা ভবনের নকশা, নির্মাণ শৈলীতে আবদ্ধ নেই। এটি সেই গণপরিসরের আখ্যান যেখানে জনগণ, জনপরিসর, প্রকৃতি একে অন্যের সহযোগী হয়ে অবস্থান করছে। এগুলো এমন জনপরিসরের প্রস্তাব, যেখানে মানুষ একত্র হতে পারে, বিশ্রাম নিতে পারে, আলাপ করতে পারে কিংবা সাময়িক আশ্রয় পেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব স্থাপনা মানুষের প্রয়োজন ও স্থানীয় পরিবেশ-প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে করা হয়েছে।

প্রদর্শনীর কিউরেটোরিয়াল বক্তব্যেও উঠে এসেছে বঙ্গীয় বদ্বীপের পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির কথা। পানি ও পলির অবিরাম রূপান্তরে গড়ে ওঠা এ ভূখণ্ডে স্থায়িত্বের চেয়ে অভিযোজনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাস্তবতা থেকেই স্থপতিরা স্থানীয় উপকরণ, কারুশিল্প এবং জলবায়ু-সহনশীল নির্মাণকৌশলকে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্যাভিলিয়নগুলো এমনভাবে নির্মিত, যাতে বাতাস, আলো ও আর্দ্রতা স্থাপত্যের বাইরের উপাদান না হয়ে তারই অংশ হয়ে ওঠে। প্রদর্শনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকও তাই জনপরিসরে মধ্যবর্তিতার ধারণা। তবে এর আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে যা প্রদর্শনীতে উহ্য। সেটি হলো, সহাবস্থানের স্থাপত্য প্রদর্শনী বাংলাদেশের নগরায়ন পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেই ভাবনার উদ্রেক ঘটায়।

দ্রুত নগরায়নশীল শহরে ভবনের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মানুষের জন্য উন্মুক্ত পরিসর কমেছে। হাতেগোনা কয়েকটি পার্ক ছাড়া মানুষের নির্বিঘ্নে হেঁটে যাওয়ার মতোও ফুটপাত নেই। সংকুচিত হতে হতে খেলার মাঠ প্রায় হারিয়ে গেছে, জলাধার হারিয়েছে, বিশ্রাম বা সামাজিক মেলামেশার জায়গা কমেছে। এমনকি একটি আবাসিক এলাকার বসবাসরত বাসিন্দারা নিজেদের সঙ্গে পরিচিত নয়। কেন? কারণ সেখানে নিজেদের বসার মতোও কোনো উন্মুক্ত স্থান, কোনো বাগান বা দাঁড়ানোর মতো সামান্য ‘স্পেস’ নেই। অর্থাৎ শহর ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।

এ লেখার শুরুটা করেছিলাম ইয়ান গেলের উক্তি দিয়ে। শেষেও আরো একবার তার কথা আনতে হচ্ছে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর একটি হলো ‘লাইফ বিটুইন বিল্ডিংস’। তার গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা এ বইয়ে গেল দেখিয়েছেন, একটি শহরের গুণগত মান স্থাপত্যের সৌন্দর্য দ্বারা নির্ধারণ হয় না। বরং মানুষ সেখানে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারে, থামতে পারে, কথা বলতে পারে এবং একসঙ্গে সময় কাটাতে পারে—তার ওপর নির্ভর করে। এ কথার আলোকে অনুধাবন করা যায় দেশের শহরগুলোর দুরাবস্থা।

নিউইয়র্কের সড়কে কনসার্ট হয়, একক সঙ্গীতের আয়োজন হয়, কিন্তু ঢাকার অন্যতম সড়কগুলোয় কেবল আন্দোলন হয়, যানজট হয়। জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। শব্দদূষণের কারণে সড়কের পাশে দাঁড়ানো যায় না, সড়কের পাশের বেঞ্চে, যাত্রী ছাউনিতে দু’দণ্ড বসা যায় না। এখানে সহাবস্থানের সুযোগ কম, অন্তর্ভুক্তিমূলক জনপরিসরের অভাব তীব্র। জলবায়ু-সংবেদনশীল জনপরিসরও কম। নয়তো হঠাৎ বজ্রপাতসহ বৃষ্টি নেমে এলে কৃষক দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে পারে না কেন। যেই নান্দনিকতার প্রকাশ প্রদর্শনীটি তুলে ধরেছে, তা শেষপর্যন্ত এসব প্রশ্নই ছুঁড়ে দিচ্ছিল যেন।

আরও