উকিল মুন্সীর প্রতিকৃতি

অনুপস্থিত সাংস্কৃতিক মুখের সম্ভাব্য পুনর্গঠন

বাংলার সমৃদ্ধ গীতধারায় উকিল মুন্সীর অবস্থান অনন্য। গানে ভাবগভীরতা ও প্রকৃতিসংলগ্নতার পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় জীবন তাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।

মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পরও জনপরিসরে তিনি রয়ে গেছেন এক ধরনের রহস্যময় সাংস্কৃতিক চরিত্র হিসেবে। তার কোনো প্রামাণ্য আলোকচিত্র বা সমসাময়িক ভিজ্যুয়াল দলিলও পাওয়া যায়নি। এই অনুপস্থিতিই তাকে ঘিরে ভুলবোঝাবুঝি ও কৌতূহল দুটোই বাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে, গবেষণাভিত্তিক একটি প্রতিকৃতি উন্মোচন করেছে হাজারীবাগের কুন ক্রিয়েটিভ স্টুডিও।

‘বিচ্ছেদের বাজার: বিরহের ঐতিহ্য এবং সমকালীন বিচ্ছিন্নতার পুনর্পাঠ’ শীর্ষক এক আয়োজনে সম্প্রতি প্রতিকৃতিটি উন্মোচন করা হয়। ১২ জুন—অনুষ্ঠানের দিনটি ছিল ভাটি অঞ্চলের মহাজন উকিল মুন্সীর জন্মবার্ষিকী। ১৮৮৫ সালে জন্ম নেওয়া এ সাধকের জীবন, গান, দর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। প্রদর্শিত হয় একটি প্রামাণ্যচিত্রও। আয়োজনটির কিউরেটর এবং ‘উকিল মুন্সী প্রতিকৃতি পুনর্গঠন প্রকল্প’-এর গবেষণা সমন্বয়ক ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের থ্রিডি আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ জাহিদুল হক।

অনুষ্ঠানে একাধিক পর্ব থাকলেও সবচেয়ে আলোচিত অংশ উকিল মুন্সীর গবেষণাভিত্তিক প্রতিকৃতির উন্মোচন। ১৯৭৮ সালে মৃত্যুবরণ করা এ সাধকের কোনো আলোকচিত্র বা সমসাময়িক প্রতিকৃতি সংরক্ষিত না থাকায় গবেষকরা আত্মীয়স্বজনের বর্ণনা, পারিবারিক মুখাবয়বের সাদৃশ্য এবং স্থানীয় ইতিহাসের তথ্যের ভিত্তিতে এই গীতিকবির সম্ভাব্য চেহারার পুনর্গঠন করেছেন।

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো নিশ্চিত প্রতিকৃতি নয়; বরং ঐতিহাসিক ও পারিবারিক সূত্রের ভিত্তিতে নির্মিত একটি গবেষণামূলক উপস্থাপনা।

মোহাম্মদ জাহিদুল হক বলছিলেন, ‘উকিল মুন্সিকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা একটি মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হই। বাংলা গানের জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন গীতিকার ও শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো প্রামাণ্য প্রতিকৃতি বা আলোকচিত্র আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অথচ তাঁর গান, জীবন ও প্রভাব এখনো মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত।’

বিষয়টিকে তিনি দার্শনিক অনুসন্ধান হিসেবেও বিবেচনা করেন, যাকে বলছিলেন ‘অনুপস্থিতি’র প্রতি আগ্রহ। তার ভাষায়, ‘আমরা ভাবতে শুরু করি—ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি হারিয়ে গেলে বা না থাকলে, তার মুখ সম্পর্কে কি আর কোনো অনুসন্ধান সম্ভব নয়?’

গুগল অনুসন্ধানে পুরো প্রক্রিয়া জানা না গেলেও কুন ক্রিয়েটিভের ভাষ্য খুবই সতর্ক। শিল্পী আব্দুল্লাহ আল মামুন জয়ের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত এই প্রতিকৃতি প্রদর্শনের সময় কুন ক্রিয়েটিভ একটি বিশেষ ডিসক্লেইমার বা ‘অথেন্টিসিটি নোট’ যুক্ত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির একেবারেই ভিজ্যুয়াল রেকর্ড না থাকলে তার ‘নির্ভুল প্রতিকৃতি’ তৈরি করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞান যা করতে পারে, তা হলো একটি সম্ভাব্য মুখাবয়বের পুনর্গঠন। শিল্পের ভাষায় এটি ‘এক্স্যাক্ট পোর্ট্রেট’ নয়; বরং ‘হিস্টোরিক্যালি ইনফর্মড রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘ফরেনসিক অ্যাপ্রক্সিমেশন’।

জাহিদুল হক বলেন, ‘আমরা প্রতিকৃতি আকাকে শুধু শিল্পকর্ম হিসেবে নয়, একটি অনুসন্ধানমূলক প্রকল্প হিসেবেও দেখেছি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, পারিবারিক বৈশিষ্ট্য, সমসাময়িক বাউলদের ভিজ্যুয়াল রেফারেন্স এবং মাঠগবেষণার তথ্য মিলিয়ে একটি সম্ভাব্য মুখাবয়ব পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছি।’

‘আমরা কখনো দাবি করছি না যে এটিই উকিল মুন্সীর চূড়ান্ত বা একমাত্র প্রতিকৃতি। বরং এটি গবেষণার ভিত্তিতে নির্মিত একটি সম্ভাব্য ভিজ্যুয়াল পুনর্গঠন, যা ভবিষ্যতে নতুন তথ্যের আলোকে আরো সমৃদ্ধ বা সংশোধিত হতে পারে।’

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে গত শতকের শুরু থেকে প্রায় সাত দশক ধরে উকিল মুন্সীর বিস্তৃত বিচরণ ছিল। তাকে সাধারণত মসজিদের ইমাম এবং একই সঙ্গে গায়ক-গীতিকবি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। যদিও তার জীবন ছিল নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কুন ক্রিয়েটিভের প্রতিকৃতিতে তাকে বয়সী এবং ইমামসুলভ এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এবং এটি তাকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণা।

প্রতিকৃতি নির্মাণের পদ্ধতিতে কুন ক্রিয়েটিভের প্রামাণ্য সূত্র অনুসরণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। গবেষণামূলক ও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি কাঠামো অনুসরণ করার চেষ্টা সেখানে স্পষ্ট। এ প্রসঙ্গে জাহিদুল হক বলেন, ‘আমরা মূলত উকিল মুন্সীর একটি প্রতিকৃতি নয়, বরং তার সম্ভাব্য মুখাবয়ব পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছি। এই দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।’

সাধারণত এ ধরনের প্রতিকৃতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশেষ পরিচয় বা জনধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। অনেক সময় তা ঐতিহাসিক ব্যক্তিকেই আড়াল করে ফেলে। জাহিদুল বলেন, ‘উকিল মুন্সীর কোনো আলোকচিত্র বা প্রত্যক্ষ ভিজ্যুয়াল রেফারেন্স আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে আমরা যদি তাঁকে প্রচলিত অর্থে ভাবাবিষ্ট বাউল, বিরহাক্রান্ত সাধক বা অলৌকিক অভিব্যক্তির মানুষ হিসেবে চিত্রিত করতাম, তাহলে সেটি মূলত আমাদের কল্পনার প্রতিফলন হতো, উকিল মুন্সীর নয়।’

‘প্রজেক্ট: উকিল মুন্সীর প্রতিকৃতি নির্মাণ’ শিরোনামের একটি প্রকল্প-রূপরেখা আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, স্মৃতিনির্ভর প্রতিকৃতি নির্মাণে তারা প্রশ্নোত্তরের একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে সরাসরি ‘তিনি দেখতে কেমন ছিলেন’—এমন প্রশ্ন করা হয় না। বরং জানতে চাওয়া হয়—গ্রামের কার সঙ্গে তার চেহারার মিল ছিল? বর্তমান পরিবারের মধ্যে কার মুখাবয়ব সবচেয়ে কাছাকাছি? কোন বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে বেশি মনে আছে? এমনকি বলা হয়—তিনি যখন গান গাইতেন তখন কেমন লাগত, মেলায় গেলে কী ধরনের পোশাক পরতেন, রাগ করলে মুখের অভিব্যক্তি কেমন হতো। এ ধরনের প্রশ্নের উদ্দেশ্য হলো প্রাসঙ্গিক স্মৃতির ভেতর থেকে ভিজ্যুয়াল স্মৃতিকে উন্মুক্ত করা।

প্রকল্প-প্রস্তাবনায় একটি ধাপকে ‘খুব জরুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে চারটি বিষয় এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে—‘বিখ্যাত বাউল মানেই রহস্যময় মুখ’, অতিরিক্ত আদর্শায়ন, আধুনিক সিনেমাটিক আলোকায়ন এবং অযথা নায়কোচিত বা আকর্ষণীয় করে তোলা। কারণ এসব প্রবণতা ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণকে সহজেই মিথ-নির্ভর নির্মাণে পরিণত করতে পারে।

এ বিষয়ে জাহিদুল হকের মন্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করেছি, যে মানুষটির প্রকৃত মুখই ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে, তাঁর ওপর নতুন করে কোনো প্রতীকী পরিচয় আরোপ করার আগে তার মানবিক উপস্থিতিটিকে যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধার করা জরুরি।’

‘তাই প্রতিকৃতিতে আমরা কোনো নাটকীয় আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি, সংগীত পরিবেশনের ভঙ্গি বা সাধকসুলভ মুদ্রাকে প্রাধান্য দিইনি। বরং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, পারিবারিক বৈশিষ্ট্য এবং সমসাময়িক ভিজ্যুয়াল রেফারেন্সের ভিত্তিতে একটি সংযত ও নিরপেক্ষ মুখাবয়ব নির্মাণের চেষ্টা করেছি।’

অথেন্টিসিটি নোটে বলা হয়েছে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নৃবিজ্ঞান, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির মধ্যবর্তী একটি ‘মাল্টি-সোর্স রিকনস্ট্রাকশন’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। দলটির সদস্যরা মূলত দৃশ্যশিল্পী হওয়ায় বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় করে একটি সম্ভাব্য মুখাবয়ব নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, প্রতিকৃতি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ কেন উকিল মুন্সী? এটি তো এক ধরনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই! মোহাম্মদ জাহিদুল হক বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন না। তার মতে, ‘ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রহের একটি ভূমিকা অবশ্যই আছে। তবে বিষয়টি শুধু ভাবসংগীতের প্রতি অনুরাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’

কারণ, ‘আমাদের কাছে উকিল মুন্সী গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি ভাটি অঞ্চলের বিরহধারার অন্যতম প্রধান কণ্ঠ। তার গান শুধু আধ্যাত্মিক বিচ্ছেদের কথা বলে না; মানুষের অস্তিত্ব, অভাব, অনুপস্থিতি, সম্পর্ক এবং সামাজিক বাস্তবতার গভীর অভিজ্ঞতাও ধারণ করে।’

তবে এখানেই উদ্যোগটির সমাপ্তি নয়। জাহিদুল হক বলেন, ‘আমরা উকিল মুন্সীর একটি ছবি তৈরি করিনি; বরং অনুপস্থিত একটি সাংস্কৃতিক মুখের সম্ভাব্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছি। আমাদের কাছে এটি যেমন শিল্পচর্চা, তেমনি স্মৃতি, ইতিহাস ও উত্তরাধিকার নিয়ে গবেষণারও একটি প্রকল্প।’

বাংলাদেশের গণসংস্কৃতি, জনপদের ইতিহাস এবং চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন, যাদের কাজ বেঁচে আছে, কিন্তু চেহারা বা ভিজ্যুয়াল দলিল হারিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় গবেষণা, তথ্য ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের আরো প্রকল্প নিয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছেন কুন ক্রিয়েটিভের। এর সঙ্গে মোহাম্মদ জাহিদুল হক যোগ করেন, ‘আমরা এটিকে ধারাবাহিক প্রতিকৃতি আঁকার প্রকল্প হিসেবে দেখছি না। আমাদের মূল আগ্রহ প্রতিকৃতি নয়; বরং স্মৃতি, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে পাঠ করার সম্ভাবনা।’

আরও