কোথাও হয়তো পড়েছিলাম, ‘দুর্ভিক্ষ মাত্রই রাজনৈতিক’। আমি যখন প্রদর্শনীতে জায়গা করে নেয়া পেপার কাটিং দেখছিলাম, মনে হলো ঠিকঠাকই পড়েছি। আরো মনে পড়ছিল, দুর্ভিক্ষ উৎপাদনের সমস্যা তো বটে, তবে তার চেয়ে বেশি সরবরাহ বা বণ্টনগত অসাম্য। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ প্রসঙ্গে গবেষক আলতাফ পারভেজ ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনর্পাঠ’ বইয়ে সূত্র উল্লেখ করে লিখছেন, ‘ভুল রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা এ সময় কীভাবে সমাজকে বিপন্ন করে তুলেছিল তার বড় নজির দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬-এর মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু খাদ্যপ্রাপ্যতা সবচেয়ে বেশি ছিল ১৯৭৪ সালে। আবার মুজিব নিজেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পার্লামেন্টে উল্লেখ করেন, “বিগত তিন বছরে সরকার ২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা সমতুল্য বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছে।” অন্যদিকে সে সময় মুজিবের অন্যতম রাজনৈতিক মিত্র সিপিবির তৃতীয় কংগ্রেসের রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী: “আওয়ামী লীগ শাসন আমলে ৫ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার (তখন ১ ডলার = ১৫ টাকা হিসেবে) বিদেশী সাহায্য এসেছিল।” এত বিপুল সাহায্যের পরও চুয়াত্তরে মানুষ ভয়াবহ খাদ্য সংকটে ভোগে।’ (পৃষ্ঠা ২৭৭)
গত ১ ও ২ নভেম্বর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: মুজিববাদের তৃতীয় বছর’ শীর্ষক প্রদর্শনী। সেখানে ঠাঁই পেয়েছিল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকালীন পত্রপত্রিকা এবং পরবর্তী সংকলনে উঠে আসা দুর্ভিক্ষের ছবি ও খবরের সংগ্রহ।
চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনেকটা মিথের মতো। এর অনেক কারণও আছে; যার অন্যতম রাজনীতি, ক্ষমতা যা ইতিহাসের একটি অংশকে প্রান্তিক ও আলোচনার অযোগ্য বা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ করে তুলেছিল। এ কারণে জেন-জির মতো প্রজন্মে দাদা-নানার বয়সীদের স্মৃতি ও সাক্ষ্য ছাড়া তেমন কোনো উপলক্ষ নেই এ বিষয়ে জানার। যদি না কোনো সূত্রে আগ্রহী হয়ে সে বইয়ের পাতায় ঢুঁ মারে। সব মিলিয়ে সেই স্মৃতি অনেক দূরের মনে হতে পারে। কিন্তু প্রদর্শনীতে তুলে ধরা ছবি ও গল্প দর্শকদের পরিচিতই মনে হবে। কারণ শোষণ ও বঞ্চনার এ রূপ নানাভাবে আমরা দেখে এসেছি।
প্রথাগত চিত্র প্রদর্শনীর মতো নয়; এখানে নন্দন বা শিল্পশৈলীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেয়েছে মানবিক দিক। যেখানে প্রেম-লালসা বা নিরপেক্ষ সৌন্দর্যের স্তুতি নেই। আছে ক্ষুধার্ত মুখ। সদ্য স্বাধীন দেশ, যখন স্বপ্ন ও প্রত্যাশা হাত ধরাধরি করে চলে; তখন কেন পত্রিকার শিরোনাম এমন হয়, ‘অইলে খাওঅন দেইন, নাইলে গুলী কইরা মারইন’, ‘ভাত দে হারামজাদা! তা-নইলে মানচিত্র খাবো’ (রফিক আজাদের বিখ্যাত কবিতার লাইন থেকে উদ্ধৃত শিরোনাম), ‘অনাহারের জ্বালায় সন্তান বিক্রি ও সন্তান হত্যার হিড়িক’, ‘ক্ষুধায় জ্বালায় মর্মান্তিক মৃত্যু, স্ত্রী হত্যা গলায় দড়ি’, ‘কুমিল্লায় লঙ্গরখানার হাল: মাঝে মাঝে বন্ধ থাকে। রুটির বদলে আটা দিয়ে বিদায়’, ‘জাতীয় কৃষক লীগ নেতৃদ্বয়ের অভিযোগ: আওয়ামী বাটপাড়রা রিলিফ সামগ্রী আত্মসাৎ করছে’, ‘ক্ষুধার্ত পিতা কর্তৃক শিশুকন্যাদের পানিতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে’, ‘বাংলার শিশুদের বাঁচাও’, ‘জোতদার মজুতদার চোরাচালানীদের দাপট সমানেই চলছে; দুর্ভিক্ষ: রংপুর জেলায় কমপক্ষে ৫০ হাজার লোকের মৃত্যু’। আসলে এত এত বিবরণ প্রয়োজনও পড়ে না। স্রেফ দুটো শব্দই আক্রান্ত করতে পারে, ‘জঠর জ্বালায়’। হত্যা, আত্মহত্যার মতো ঘটনা বলছে, দুর্ভিক্ষে শুধু সামাজিক সম্পর্কই শেষ হয়নি, পারিবারিক সম্পর্কে বিয়োগান্ত অবক্ষয় ঘটেছিল। ক্ষুধার কাছে পরাজিত হয়েছিল স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা।
‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: মুজিববাদের তৃতীয় বছর’ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বেশ কয়েকটি কার্টুন। ১৯৭৪ সালে টাঙ্গাইল শহীদ মিনারে প্রদর্শিত হয়েছিল মোয়াজ্জেম হোসেনের এসব কার্টুন। কার্টুন কীভাবে সময়ের ভাষ্য হয়ে ওঠে সেই নজির রয়েছে প্রয়াত এক শিল্পীর আঁকা ও লেখায়। একটা কার্টুনে দেখা যাচ্ছে একদল ভুখা-নাঙ্গা মানুষ মিছিল করে এগিয়ে আসছে। তাদের একজনের হাতে প্ল্যাকার্ড ‘অন্ন চাই বস্ত্র চাই বাঁচার মতো বাঁচতে চাই’। এ মিছিল দেখে ‘মুজিব কোট’ পরা এক লোক পালাচ্ছে। আর বলছে, ‘বাঁচাও! বাঁচাও!! রাজাকার-দালালরা মেরে ফেলল...’। বিষয়টি কি পরিচিত ঠেকছে? আরেক কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, ভুখা-নাঙ্গা এক লোককে একজন রাজনৈতিক নেতা মারতে মারতে বলছে, ‘ব্যাটা হারামজাদা! দুর্গত এলাকা ভ্রমণ এমনিতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে—এসেছিস সাহায্য চাইতে ...’। অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নই যে সবচেয়ে বড় রাজনীতি সেটা বাংলাদেশের প্রথাগত রাজনীতি আর কবে শিখবে?
প্রদর্শনীতে তুলে ধরা স্থির-নির্বাক ছবিগুলো হাজার হাজার শব্দে লেখার চেয়ে বা বলার চেয়েও গুরুতর বার্তা তুলে ধরে। সমাজ, জীবন, মানুষ ও তার নিয়তির বিড়ম্বনা তো বটেই। এমনকি এসব গল্প-বেদনা লালন না করার পরিণতিও আমরা দেখি। ইতিহাসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ইতিহাস হয়তো পুনরাবৃত্তিময়, তবে তার বাঁক ও দিক আলাদা।
‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: মুজিববাদের তৃতীয় বছর’ প্রথাগত কিউরেটিয়াল প্রদর্শনী নয়। অ্যান্ট ফ্যাসিস্ট কোয়ালিশন খুব পুরনো সংগঠন নয় সম্ভবত। যাদের সঙ্গে দেখা হলো, তারা সবাই তরুণ। তবে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তার লক্ষ্য ও অভীন্সা স্পষ্ট। প্রদর্শনীতে দৈনিক সংবাদ, পূর্বদেশ, ইত্তেফাক বা গণকণ্ঠ থেকে নেয়া ছবি-খবর স্থান পেয়েছে। সেখানে প্রধান ত্রুটি হলো, প্রদর্শনের সুনির্দিষ্ট কোনো বিন্যাস নেই। একই সঙ্গে ছবি বা পেপার কাটিং ও শিরোনামের বাইরে কিউরেটিয়াল কোনো লক্ষ্য উঠে আসেনি। এছাড়া পুরো প্রদর্শনীতে আর্কাইভিংয়ের প্রতি অবহেলা চোখে পড়ার মতো। ছবি ও খবর প্রকাশের তারিখ ও মাধ্যম এবং প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কোনো বর্ণনা নেই। আরো বড় পরিসরে ফটোগ্রাফারদের নামের অনুল্লেখ চোখে পড়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আয়োজকদের কাছ থেকে শোনা গেল, যথাযথ প্রস্তুতি ও গবেষণার জন্য সময়ের অভাবের কথা। এছাড়া আরো একটি মজার তথ্য পাওয়া গেল। তাদের সংগ্রহ করা পেপারকাটিংগুলোর উৎস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। অনুমানযোগ্য ‘অজ্ঞাত কারণে’ অনেক বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু সময়ের সংবাদপত্র এ লাইব্রেরিতে পাওয়া যেত না। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুরনো সংবাদপত্রগুলো নাকি পাঠকক্ষে ফিরে এসেছে। সেখান থেকে তারা তাড়াহুড়ো করে ডকুমেন্টেশনের উদ্যোগ নেন, একইভাবে তাড়াহুড়োর সঙ্গে মনে করেছেন—যত দ্রুত সম্ভব এসব চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরা দরকার। সেই ভাবনা থেকে ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: মুজিববাদের তৃতীয় বছর’। আশা করি, পরবর্তী কাজে তারা এ বিষয়ে মনোযোগী হবেন। তবে নিজ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অবদান তুলে ধরায় তারা ধন্যবাদ পাবেন অবশ্যই।
নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের বিখ্যাত গবেষণা ‘প্রভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস’-এও কেস স্টাডি হিসেবে উঠে এসেছে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ। ওই গবেষণায় তিনি দেখান, দুর্ভিক্ষের কারণ খাদ্যাভাব নয়, রাষ্ট্রে ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতার অভাব। খাদ্য কে পাবে আর কেন, কোন মাত্রায় পাবে সেটা ঠিক করে দেয়া রাজনীতির কারণে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল।
বাংলাদেশে ভাত-কাপড়ের দুর্ভিক্ষের বাইরে আরো একটি দুর্ভিক্ষের কথা আমরা মোটাদাগে শুনে এসেছি। যেটা হলো ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’। যেখানে সুনির্দিষ্ট রাজনীতিঘেঁষা ও এলিট নন্দনের বাইরে আর যা কিছু আছে তাকে রুচির বাটখারায় ফেলে দিতে হবে। কিন্তু পেটের আগুনে, বৈষম্যের আগুনে সবই তো পুড়ে! সেটা তো আমরা দেখেই আসছি।