কমবেশি সব জনগোষ্ঠীর অভ্যুদয়ের নিজস্ব ইতিহাস আছে। তবে আদি যুগে ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টি খুব একটা সহজ ছিল না। আবার এক্ষেত্রে সচেতনতারও অভাব ছিল। তাই বহু জাতিগোষ্ঠীর উৎপত্তির ইতিহাসের দলিলে যেমন প্রমাণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, লিপিবদ্ধ করা হয়েছে জনশ্রুতিও। বাংলাদেশের ‘মণিপুরি’ সম্প্রদায় তেমনই এক আদি জনগোষ্ঠীর নাম, যাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও কিংবদন্তি। সেই সঙ্গে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী জীবনাচরণও, যা তারা আজও যাপন করে যাচ্ছে। সেই জীবনধারাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘মণিপুরী: অ্যান এথনিক কমিউনিটি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোর ইশকুল কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ফটোগ্রাফি চক্রের মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে এ বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ১২ ডিসেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
মণিপুরি নৃগোষ্ঠীর আদি নিবাস হলো ভারতের মণিপুর রাজ্য। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে, বিশেষত ১৭৪১ সাল থেকে নানা যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রেক্ষাপটে তারা অভিবাসন করে। অভিবাসনকারী একাংশ এ দেশের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসে বসতি গড়ে তোলে। ঐতিহাসিকভাবে তাদের বসতি অঞ্চলকে ‘মণিপুরিপাড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মণিপুরিপাড়া এবং এ নৃগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালি শোভিত হয়েছে আলোকচিত্রী কাউছার হাবিব সোমেল, আসহাবুল হক নান্নু ও মোহাম্মদ হারুন আর রশীদের তোলা ছবিতে। তাদের আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন কেএম জাহাঙ্গীর আলম।
প্রকৃতি ও মানুষ ছবি: আসহাবুল হক নান্নু
গ্যালারি ঘুরে প্রদর্শনী দেখলে উপলব্ধি করা যায়, সময়ের বিবর্তনে অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঔজ্জ্বল্য ম্রিয়মাণ হলেও মণিপুরি জনগোষ্ঠী আজও আপন বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। তারা সময়ের সঙ্গে তাল মেলালেও নিজস্বতার চর্চা অব্যাহত রেখেছে। সেই চর্চায় চিরাচরিত সংস্কৃতির স্থান রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালনের চর্চাও তারা করে সেই সম্প্রীতি ও সহাবস্থান ধরে রেখে। এ স্বরূপের দেখাই মেলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আর্ট গ্যালারিতে চলমান প্রদর্শনীতে।
এ দেশে সাধারণত তিনটি মণিপুরি গোষ্ঠীর বাস—বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ ও পাঙান। গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে তাদের মধ্যে কয়েকজনের মুখের প্রতিকৃতি (পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফ)। চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তীর্ণ নীলাকাশ ও ফসলি জমি। তার মধ্যে সংকীর্ণ এক পিচঢালা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একজন ব্যক্তি। অন্য ছবিতে দেখা যায় পাশেই এক ফসলি জমিতে সার ছিটিয়ে দিচ্ছে একজন কৃষক। একজন বসে রান্না করছে মাটির চুলোয়। আবার কৃষি সরঞ্জাম হাতে মাঠে কাজ করছে নারীরাও। গ্রামীণ জীবনের ছাপ তাদের যাপনে স্পষ্ট। আজও মণিপুরিপাড়ার মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস কৃষি। এর বাইরে রয়েছে হাতে তৈরি বস্ত্র বুনন।
মহারাস। ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
মণিপুরি শাড়ির সঙ্গে পরিচিত নয় বা এ শাড়ির নাম শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ ঐতিহ্যবাহী শাড়ি তাঁতে বোনে তারা। তাদের পারিবারিক পেশাও বলা যায়। কেবল শাড়িই নয়, তাদের দৈনন্দিন পোশাকের অধিকাংশই তারা নিজ হাতে বানায়। মণিপুরি নারীরা কোমর অব্দি পরে ‘লাহিং’ নামক এক প্রকার ঘাগরার মতো কাপড়। আর পরে ব্লাউজ, যাকে বলা হয় ‘আহিঙ’। প্রদর্শনীর আলোকচিত্রগুলোয় তাদের পোশাক ও সাজসজ্জা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে তারা এ বিষয়ে বেশ শৌখিন। সেই সঙ্গে তাদের কর্মঠ জীবনের ধারণাও পাওয়া যায়। কী গভীর মনোযোগ ও সূক্ষ্মভাবে তারা বুনে চলেছে একেকটি বস্ত্র!
মণিপুরিরা যেমন পরিশ্রমী তেমনি যেন আনন্দপ্রিয়ও। প্রতিটি উৎসব উদযাপন করে মহাসমারোহে। তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব মহারাসলীলা। দুটি পর্বে এটি উদযাপন করা হয়। দিনের বেলায় রাখালরাস আর রাতে মহারাস। কৃষ্ণের বাল্যকালে মাঠে মাঠে বাঁশি বাজিয়ে ধেনু চরোনোর মুহূর্তগুলো অনুকরণ করা হয় রাখালনৃত্যের সময়। মহারাসের সময় রাখাল বালকই কৃষ্ণরূপে থাকেন। আর রাখালরাসের শুরুতে বালক কৃষ্ণ, বলরাম আর সখাদের গোচারণে যাওয়ার অনুমতি দিতে গিয়ে মায়েদের অশ্রুমাখা বিলাপ গীত-মুদ্রায় রূপায়িত হয়। রাসলীলায় বিভিন্ন আঙ্গিক ও মুদ্রার সমন্বয়ে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। নৃত্যের সময় গোপীরা শ্রীরাধার পোশাক, মাথায় চূড়ার ওপর ‘ককনাম’, মুখে পাতলা সাদা কাপড়ের ঢাকনা ‘মেইকুম’, গায়ে রেশমি ব্লাউজের ওপর জড়ানো সাদা লংক্লথ ‘থারেং’ ব্যবহার করে। এছাড়া ছোটখাটো বিভিন্ন সামগ্রীর ব্যবহার বিশেষ করে চন্দন, ধুতিসহ পায়ে নূপুর ব্যবহার নৃত্যকে কমনীয়, আকৃষ্ট ও মোহাবিষ্ট করে তোলে। রাসনৃত্যে গোপিনীদের সঙ্গে কৃষ্ণের মধুর লীলার কথা গানে ও সুরে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা। এসবের নান্দনিক উপস্থাপনই হলো চলমান প্রদর্শনী।
তৈরির পর শুকাতে দেয়া মণিপুরি শাড়ি
প্রদর্শনীটি আয়োজনের পেছনে কারণ সম্পর্কে এর সমন্বয়ক ও আলোকচিত্রী সংগঠক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি জানান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ফটোগ্রাফি কোর্সের বেশ কয়েকটি আবর্তন শেষ হওয়ার পর মনে এল যারা কোর্স করল তারা কীভাবে নিজেদের চর্চা অব্যাহত রাখবেন? ফটোগ্রাফি তো নিরন্তর চর্চার বিষয়। কেবল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার মাধ্যমেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে পারে। এ ভাবনা থেকে মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের যাত্রা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। চলমান প্রদর্শনীর তিনজন আলোকচিত্রী বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী মণিপুরি জনগোষ্ঠী। কেননা মণিপুরি সম্প্রদায় আমাদের দেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। নিজস্ব স্বকীয়তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত এ সম্প্রদায় আজও তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে।
উল্লেখ্য, মণিপুরি শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো মণির আলোয় আলোকিত জাতি। কথিত আছে, এক নিস্তব্ধ রাতে রাধা-কৃষ্ণ তাদের ভক্তদের হিতার্থে ভারতবর্ষের মথুরা রাজ্যের বৃন্দাবনে নিত্য ও সাধনসিদ্ধ ব্রজবনিতাদের নিয়ে রাসনৃত্যে মগ্ন থাকেন। সেই নৃত্যে পরিবেশিত গীত ও বাদ্যযন্ত্রের সুর কৈলাসপতি শিব ও তার স্ত্রী পার্বতীকে আকৃষ্ট করে। পরবর্তী সময়ে নানা ঘটনা পরিক্রমায় তাদের মধ্যেও সেই রাসনৃত্যের বাসনা জাগে এবং সেই উৎসবের আয়োজন করা হয়। শিব-পার্বতীর নান্দনিক রাসনৃত্য আয়োজনের জন্য আসামের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আট পর্বতে ঘেরা এক নৈসর্গিক জলমগ্ন স্থানকে (লোকতাগ হ্রদ) বেছে নেয়া হয়। স্থানটি নানাভাবে তাদের নৃত্য উপযোগী করে তোলার পরও একটি বাধা রয়ে যায়—গহিন অন্ধকার। তখন নাগপতি অনন্তনাগ তার মাথার নীলাভ মণির আলো দিয়ে পুরো স্থানটি আলোকিত করে তোলেন। সেই থেকে এ অঞ্চলের নাম হয় ‘মণিপুরি’। মণিপুরি রাজ্যের প্রাচীন নাম গন্ধর্বরাজ্য; আবার কখনো পার্বত্যরাজ্যও বলা হয়। মহাভারতে উল্লেখ আছে, অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার সন্তান চিত্রভানু প্রথম সেই রাজ্যের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন।