তৈয়বা লিপির জীবন যেন চলন্ত ক্যানভাস

২০০৪ সালের দিকে লিপির একটি বিখ্যাত কাজ ছিল ‘কান’ নিয়ে। হাজার হাজার কানের প্রতিকৃতি, যার মাঝে একটি ভিডিও স্ক্রিনে চোখ ও অন্যান্য ইন্দ্রিয় ভেসে উঠত। এটি কেবল কানের প্রদর্শনী ছিল না, এটি ছিল সমাজের কান পাতা, নজরদারি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার এক নীরব প্রতিবাদ।

বন্ধুর পীড়াপীড়িতে হাতে লিখে আইরিশ মিউজিয়ামে আবেদনপত্র পাঠিয়েছিলেন শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি । তার ধারণা ছিল, নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু সেই আবেদনই খুলে দেয় ইউরোপে শিল্পচর্চার নতুন দুয়ার। আয়ারল্যান্ডের আইরিশ মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের রেসিডেন্সিতে কাজের সুযোগ তার সামনে উন্মোচন করে পরিচিত পরিবেশের বাইরে শিল্পকে নতুনভাবে দেখার সম্ভাবনা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে শিল্পী-আবাস, গবেষণা ও প্রকল্পে অংশ নিতে গিয়ে উপকরণ, ইতিহাস, স্মৃতি ও মানুষের জীবনকে ঘিরে গড়ে ওঠে তার শিল্পের স্বতন্ত্র ভাষা।

সম্প্রতি মালিবাগের কসমস সেন্টারে তাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ‘বিইং অ্যান্ড বিলংগিং’ শীর্ষক সেমিনারে জীবনের এমনই নানা অধ্যায়ের পসরা খুলে বসেন এ শিল্পী। ফিরে দেখেন নিজের শিল্পী হয়ে ওঠার পথ, বিভিন্ন দেশে কাজের অভিজ্ঞতা এবং কীভাবে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও চারপাশের বাস্তবতা তাঁর শিল্পের ভাষা হয়ে উঠেছে।

শিল্পী হিসেবে লিপির এ যাত্রায় ভৌগোলিক দূরত্ব পেরোনোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরিচিত বস্তুকে নতুন চোখে দেখা। ডাবলিনের নিখুঁত স্টুডিও, ফিনল্যান্ডের আলভার আল্টোর জন্মস্থানের কাছে পাইন বনের নীরবতা কিংবা আটলান্টিকের তীরে আয়ারল্যান্ডের এক পরিত্যক্ত প্রাচীন গ্রাম—সবই তার কাজের প্রেরণা জুগিয়েছে। পাথর, গাছের ডাল, ব্লেড, সেফটি পিন কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য সামগ্রী—তার কাছে এগুলো কেবল শিল্প নির্মাণের উপকরণ নয়। প্রতিটি বস্তুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি, সামাজিক অর্থ ও অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রেক্ষাপটে হাজির করেন তিনি। ফলে তার কাজের সামনে দাঁড়িয়ে দর্শক শুধু একটি শিল্পকর্ম দেখেন না, পরিচিত বাস্তবতা সম্পর্কেও নতুন করে ভাবার সুযোগ পান।

২০০৪ সালের দিকে লিপির একটি বিখ্যাত কাজ ছিল ‘কান’ নিয়ে। হাজার হাজার কানের প্রতিকৃতি, যার মাঝে একটি ভিডিও স্ক্রিনে চোখ ও অন্যান্য ইন্দ্রিয় ভেসে উঠত। এটি কেবল কানের প্রদর্শনী ছিল না, এটি ছিল সমাজের কান পাতা, নজরদারি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার এক নীরব প্রতিবাদ।

তার শিল্পচর্চায় উঠে এসেছে ইতিহাসের নানা উপাদান। এরই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০০৫ সালে লন্ডনে নীলকে কেন্দ্র করে তার নির্মিত শিল্পকর্মের প্রদর্শনী, যেখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিল্পের ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। একই ইতিহাস একেকজন একেকভাবে দেখেন, ব্যাখ্যা করেন; আবার ক্ষমতা ও আধিপত্যের কারণে ইতিহাসের অনেক অভিজ্ঞতা আড়ালেও থেকে যায়। সেই আড়ালে পড়ে থাকা অভিজ্ঞতাকে সামনে আনার দায়বদ্ধতা থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে নীল চাষ ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শোষণের ইতিহাসকে বেছে নেন তার বিষয়বস্তু হিসেবে। নীল উৎপাদনের পেছনে কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের ক্ষমতা কাঠামোকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ছোটবেলায় শেখা রানী ভিক্টোরিয়াকে নিয়ে একটি ছড়ার স্মৃতিও। ছড়াটি তার মনে দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গিয়েছিল। এ স্মৃতির ওপর ভর করেই মহারানী ভিক্টোরিয়াও হয়ে ওঠেন তার কাজের বিষয়বস্তুতে। শিশুমনে ছড়ার ছন্দে জায়গা করে নেয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা শোষণ ও ক্ষমতার গল্পগুলো শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন তিনি।

২০০৭ সালে তাইওয়ানের গ্রিন আইল্যান্ডে রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য ব্যবহৃত সাবেক কারাগার নিয়ে গবেষণাও তার শিল্পীজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বরফশীতল সেই অন্ধকার প্রিজনার সেলে একসময় বন্দি ছিলেন রাজনৈতিক বন্দি, লেখক ও শিল্পীরা। সেখানে জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যেত অতল সমুদ্র অথচ বন্দিদের জন্য পানি সাপ্লাইয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। টয়লেটের ফ্ল্যাশ টেনে পানি বের করে তারা জমিয়ে রাখতো তাদের ব্যবহারের জন্য। এ ট্র্যাজেডি ও হাহাকারকে লিপি তুলে এনেছিলেন পেপার ইনস্টলেশন ও ফটোগ্রাফির মাধ্যমে। বন্দিদের স্মৃতি, কারাগারের পরিবেশ এবং সেখানে দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধতা আলোকচিত্র, কাগজ, কারাগারের পোশাক ও স্থানিক বিন্যাসের মধ্য দিয়ে বন্দিত্বের অভিজ্ঞতা প্রকাশের চেষ্টা করেন তিনি।

তার শিল্পে রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্মৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে যুক্ত পুরনো বস্তু, দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী কিংবা জীবনের বিশেষ মুহূর্তের স্মারক—এসবের মধ্য দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তার দাদার গ্রামোফোন, মায়ের ড্রেসিং টেবিল ও হুইলচেয়ার কিংবা বিয়ের স্যুটকেস—জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব স্মৃতিচিহ্নই তার শিল্পের উপাদান হয়ে উঠেছে। একটি পরিচিত বস্তু নতুন বিন্যাসে হাজির হলে তার অর্থও বদলে যায়। বস্তুটি তখন শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; হয়ে ওঠে স্মৃতি, পরিচয় ও সম্পর্কের বাহক।

নারীর শরীর, জীবন ও সামাজিক প্রত্যাশা লিপির শিল্পচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ব্লেড ও সেফটি পিনের মতো উপাদান দিয়ে তৈরি তার কাজগুলোতে সৌন্দর্য ও অস্বস্তির দ্বৈততা পাশাপাশি উপস্থিত। পোশাক, ভোগসংস্কৃতি ও নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে কাজের এ সিরিজ। পরিচিত ও আকর্ষণীয় অবয়বের ভেতরে বিপদের উপস্থিতি তাঁর শিল্পের দ্ব্যর্থক ভাষাকে স্পষ্ট করে।

ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে ঔপনিবেশিক ইতিহাস, নারীর জীবন থেকে রাজনৈতিক বন্দিত্ব—বিষয়ের এ বৈচিত্র্য লিপির শিল্পচর্চাকে একক কোনো ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে রাখে না। উপকরণ নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং প্রতিটি বিষয়কে নিজস্ব প্রেক্ষাপটে বোঝার চেষ্টা তার কাজের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে কীভাবে নিজের শিকড় ও লোকজ ঐতিহ্য ধারণ করে বৈশ্বিক ভাষায় কথা বলা যায়, তৈয়বা বেগম লিপির এ দীর্ঘ শৈল্পিক যাত্রা তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পের আসল শক্তিমত্তা দামি উপাদানে নয়—বরং শিল্পীর নিখাদ সৎ ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি আর সাধারণের মাঝে অসাধারণকে খুঁজে নেয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।

গ্রেট ওম্যান স্কাল্পটরসের একজন

একটি র‍্যাকে সারিবদ্ধভাবে ঝুলছে নারীদের হরেক রঙের পোশাক। দূর থেকে দৃশ্যটি বড্ড চেনা ও সাধারণ মনে হলেও কাছে ঘেঁষলেই চমকে উঠতে হয়। পোশাকগুলো সুতো বা কাপড়ের নয়—তৈরি হয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের ব্লেড ও সেফটি পিন দিয়ে! কৌতূহল ও আকর্ষণের সঙ্গে এক অদ্ভুত অস্বস্তি এসে ভর করে দর্শকের মনে। দৈনন্দিন জীবনের এমন পরিচিত অনুষঙ্গকে ধারালো রূপে হাজির করে সমাজের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা সহিংসতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাস্কর তৈয়বা বেগম লিপি।

তৈয়বা লিপির এ স্বতন্ত্র শিল্পভাষা সমকালীন শিল্পবিশ্বে অর্জন করেছে বিশেষ স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রকাশনা সংস্থা ফাইডন প্রেস থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পবিষয়ক গ্রন্থ গ্রেট ওম্যান স্কাল্পটরস বইটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেনেসাঁ যুগ থেকে সমকালীন সময় পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বছরের ৩০০-এর বেশি নারী শিল্পীর কাজ স্থান পেয়েছে। এছাড়া ২০২০ সালে ফিফটি কনটেম্পরারি ওম্যান আর্টিস্ট—বইয়ে ও জায়গা করে নিয়েছে তার শিল্পকর্ম। গ্রেট ওম্যান স্কাল্পটরস বইয়ে স্থান পেয়েছে লিপির ২০১৯ সালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী কাজ ‘দ্য র‍্যাক আই রিমেম্বার’। উপকরণের বিপজ্জনক উপস্থিতি এখানে নারীর প্রতি সহিংসতা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং ভোগবাদী সংস্কৃতিতে নারীর অবস্থানের মতো জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

পৃথিবীকে আমরা যেভাবে দেখি, বাস্তবতা সবসময় তেমন সরল নয়। দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়াবহতা, আবার নেতিবাচক কোনো অভিজ্ঞতার মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে ইতিবাচকতার সূত্র। বাস্তবতার এ দ্বৈত রূপই শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপির ভাবনার অন্যতম অনুষঙ্গ।

ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিকে ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার এ উপস্থিতি বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলার জন্য এক অনন্য মাইলফলক। তবে শিল্পকর্ম দর্শকের কাছে কতটা বোধগম্য হবে, তা নিয়ে খুব বেশি ভাবিত নন লিপি। দর্শকের প্রত্যাশা পূরণের চেয়ে নিজের ভাবনাকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে রূপ দেয়াকেই তিনি প্রাধান্য দেন।

শিল্পীর এ আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গির শেকড় প্রোথিত তার শৈশবে। কোনো আনুষ্ঠানিক পাঠ নয়, বরং প্রতিদিনের পারিবারিক আবহেই গড়ে উঠেছে তার চিন্তার জগৎ। বাবার সান্নিধ্যে বই পড়ার অভ্যাস আর খাবার টেবিলে সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির খোলামেলা আলোচনা তার মনন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পেছনে ফিরে তাকিয়ে লিপি মনে করেন, জীবনযাত্রার পথ সবসময় আগে থেকে নির্দিষ্ট থাকে না। তবে লক্ষ্যকে নীরবে লালন করা এবং কাজের প্রতি সৎ থাকাটাই আসল। একজন মানুষ কী করতে চায় এবং কেন করতে চায়, সেই নিজের ভেতরের স্পষ্টতাই শিল্পীকে বহুদূর এগিয়ে নেয়।

আরও