ভ্যান গঘের তুলিতে আজও জীবন্ত ডাকপিয়ন রুলিন ও তার পরিবার

নীল পটভূমির সামনে সোনালি দাঁড়ির এক পুরুষ। একটি বেতের চেয়ারে বসে আছেন তিনি। পরনে গাঢ় নীল, ডাবল ব্রেস্টেড ইউনিফর্ম।

নীল পটভূমির সামনে সোনালি দাঁড়ির এক পুরুষ। একটি বেতের চেয়ারে বসে আছেন তিনি। পরনে গাঢ় নীল, ডাবল ব্রেস্টেড ইউনিফর্ম। সোনালি বোতামগুলো চকচক করছে। মাথায় রয়েছে ডাকপিয়নের টুপি। কর্মঠ মানুষের প্রতিমূর্তি করে তোলা হয়েছে ভ্যান গঘের তুলির স্বাভাবিকতা ও আন্তরিকতা অঙ্কনে। মজার ব্যাপার, এ ডাকপিয়ন ভ্যান গঘের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন।

ডাকপিয়নের ব্যক্তি বা এ ধারা ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে খুব একটা পরিচিত বিষয় নয়। ভ্যান গঘ মানেই যেন সূর্যমুখী, ঘরোয়া দৃশ্য বা তার নিজস্ব প্রতিকৃতি। কিন্তু ১৮৮৮ সালের ‘পোস্টম্যান জোসেফ রুলিন’-এ আঁকা এ ডাকপিয়নই শিল্পীর জীবন ও কাজে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন।

ফ্রান্সের আরলে গঘের সঙ্গে রুলিনের পরিচয়। এরপর ভ্যান গঘ তার ছবি আঁকেন। কেবল ডাকপিয়নই নয়, তার পরিবারের ছবিও এঁকেছিলেন। তালিকায় রুলিনের স্ত্রী ও তিন সন্তান ছিলেন। এ প্রতিকৃতিগুলো তৈরি হয়েছিল ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে। এর পর পরই মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিত্র বিশ্লেষক ও সমালোচকরা মনে করেন, এ ছবিগুলো কর্মঠ ব্যক্তি ও তার পারিবারিক জীবনের প্রতি ভ্যান গঘের শ্রদ্ধার প্রকাশ।

সম্প্রতি ইউরোপে প্রথমবারের মতো রুলিন পরিবারের সব প্রতিকৃতি একত্র হয়েছে আমস্টারডামের ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে। একটি প্রদর্শনীও আয়োজন হয়েছে। ‘ভ্যান গঘ অ্যান্ড দ্য রুলিনস, টুগেদার অ্যাট লাস্ট’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি ১১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস, বোস্টনের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২৫টি রুলিন প্রতিকৃতির মধ্যে ১৪টি প্রদর্শিত হচ্ছে।

ভ্যান গঘের জীবনের আরল পর্বও আগ্রহজাগানিয়া। প্যারিসে বসবাসের সময় ভ্যান গঘ শহরের নিরীক্ষাধর্মী শিল্পচর্চা এবং পরবর্তী ইমপ্রেশনিজমের নান্দনিকতা দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। কিন্তু শহুরে জীবন তাকে ক্লান্ত করে তোলে। তিনি মডেল ভাড়া করার মতো অর্থের অভাবে ছিলেন এবং লোকজনকে বোঝানোর মতো সামাজিক দক্ষতাও তার ছিল না। প্রকৃতির মাঝে ছবি আঁকার আশা নিয়ে তিনি ১৮৮৮ সালের গ্রীষ্মে আরলে চলে যান। শিল্পীদের একটি কমিউনিটি গড়ার স্বপ্নও ছিল। পরে সে বছর বন্ধু পল গগ্যাঁ তার সঙ্গে যোগ দেন এবং দুজনে মিলে ‘ইয়েলো হাউজ’-এ বাস করেন। ভ্যান গঘের ১৮৮৮ সালের চিত্র ‘দি ইয়েলো হাউজ’-এ তা ফুটে উঠেছে।

ভ্যান গঘ সামাজিকতা তেমন বুঝতেন না। তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী। আরলে গগ্যাঁর অনুপস্থিতিতে ভ্যান গঘ তার অন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য মডেল পেতেন না। তখনই তার দেখা হয় জোসেফ রুলিনের সঙ্গে। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের সিনিয়র গবেষক তেও মেইডেনডর্প ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বন্ধুত্ব করতে তার সমস্যা হতো। তিনি সহজ মানুষ ছিলেন না। কিন্তু ডাকপিয়ন রুলিনের মধ্যে তিনি সত্যিকারের বন্ধু পেয়েছিলেন।’

রুলিন ছিলেন এক পরিশ্রমী শ্রমিক। তিনি লাগেজ ও মালপত্র বহনের কাজ করতেন। ভ্যান গঘ তার সততা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও তার পরিশ্রমী শ্রেণীচেতনার প্রশংসা করতেন।

গঘের ছবিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় প্রথম প্রতিকৃতিতে রুলিনের হাত শক্ত এবং মুখে অস্বস্তির ছাপ, যেন তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে অনিচ্ছুক। ভ্যান গঘ মাঝপথে চিত্রটির দৃষ্টিকোণ বদলে হাতকে টেবিল ও চেয়ারের ওপর স্থাপন করেন—এটিও গঘের ছবির বৈশিষ্ট্য।

অন্যদিকে জোসেফ রুলিন ছিলেন সংসারী মানুষ। গঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, তিনি এ ধরনের পারিবারিক আবহ কামনা করতেন। মেইডেনডর্প বলেন, ‘পারিবারিক জীবন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা তিনি কখনো পাননি।’ এক পরিশ্রমী মানুষ, তার স্নিগ্ধ স্ত্রী আর তাদের সন্তান মিলে রুলিন পরিবারের মধ্যে গঘ দেখেছিলেন আদর্শ জীবন।

রুলিনের পর ভ্যান গঘ আঁকেন তার স্ত্রী অগাস্তিন ও তিন সন্তান—আরমাঁ, কামিয়েল ও মার্সেলকে। ইয়েলো হাউজে একাধিক সেশনে পুরো পরিবারকে আঁকার সুযোগ পেয়ে গঘ ছিলেন উচ্ছ্বসিত। অগাস্টিনের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিকৃতি ‘লা বার্সিউস’ (লালনকারী)। ছবিতে স্বামীর মতোই একই চেয়ারে বসা অগাস্টিনকে ভ্যান গঘ মাতৃমূর্তির প্রতীক হিসেবে এঁকেছেন। তিনি পাঁচটি সংস্করণ আঁকেন, যার তিনটি এখন প্রদর্শনীতে রয়েছে। প্রত্যেকটিতে অগাস্টিন দূরে তাকিয়ে আছেন। তাকে দেখাচ্ছে গম্ভীর ও মর্যাদাবান।

রুলিন ও তার পরিবারের প্রতিকৃতিগুলোতে ভ্যান গঘ তার পরবর্তী সময়ের কাজের সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্যগুলো পরিমার্জনা করেন। এগুলো ছিল এক ধরনের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত, যখন তিনি সত্যিকার অর্থে আধুনিক প্রতিকৃতিশিল্পী (পোর্ট্রেট আর্টিস্ট) হিসেবে উঠে আসেন।

আরমাঁ রুলিনের প্রতিকৃতির পটভূমিকে উদাহরণ হিসেবে আনা যায়। এর পটভূমি উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের, যা জাপানি প্রিন্ট থেকে প্রভাবিত। নীল আউটলাইন ও হলুদ রঙে ওভারপেইন্ট করা জ্যাকেট ব্যবহার করে তিনি পূর্ণতা ও প্রাণবন্ততা সৃষ্টি করেছেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি ফুলেল, অলংকৃত দেয়ালপত্রও যুক্ত করেন। লা বার্কিউস ও রুলিনের ১৮৮৯ সালের প্রতিকৃতিতে তা দেখা যায়। সেখানে রুলিনের দাড়ি ঘূর্ণায়মান অলংকৃত রেখায় আঁকা। ছবিটির এ রীতি কয়েক মাস পর তার আঁকা ‘দ্য স্টারি নাইট’ (১৮৮৯ খ্রি.)-এর ঘূর্ণাবর্তের শৈলীকে মনে করিয়ে দেয়।

এ সময়ে ভ্যান গঘের বন্ধু হয়ে ওঠেন রুলিন। ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরে ভ্যান গঘের মানসিক অবস্থার অবনতি হয়। তিনি নিজের কান কেটে ফেলেন। এরপর রুলিন প্রতিদিন হাসপাতালে তাকে দেখতে যেতেন এবং থিওকে (গঘের ভাই) খবর দিতেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরই রুলিনকে মার্সেইয়ে বদলি করা হয়।

১৮৮৯ সালের জানুয়ারির শেষে ভ্যান গঘ নিজেই সাঁ-রেমির আশ্রমে ভর্তি হন চিকিৎসার আশায়। রুলিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব তখনো টিকে ছিল চিঠির মাধ্যমে; নতুন বছর উপলক্ষে তিনি রুলিন পরিবারকে ছবি পাঠান।

ভ্যান গঘের কাছে রুলিন পরিবার ছিল অনুপ্রেরণা এবং এমন এক জীবনের প্রতীক যা তিনি কখনই পাননি। এ পরিবার ছিল আরলে গঘের দিনগুলোর সত্যিকারের সঙ্গী। আর গঘও তার তুলিতে ধরেছিলেন পরিবারটিকে। তাই শতাব্দী পার করেও রুলিন পরিবার ভ্যান গঘের তুলিতে জীবন্ত।

[লেখাটি তৈরিতে ‘আর্টসি’তে প্রকাশিত হোসি থিডিয়াস-জন্সের নিবন্ধের সাহায্য নেয়া হয়েছে]

আরও