বাঙালির শেকড় সন্ধানে ফোক আর্ট বা লোকশিল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পটচিত্র। এ পটশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যাদের পরিবার যুগ যুগ ধরে তেরপল বা কাপড়ের ক্যানভাসে ফুটিয়ে চলেছে পৌরাণিক ও লৌকিক মিথ, তাদের মধ্যে অন্যতম গাজী পটশিল্পী শম্ভু আচার্য। এ দেশের লোকশিল্পের আকাশে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা তিনি। কিন্তু ক্যামেরা, ফ্ল্যাশলাইট আর শহুরে আলোর আড়ালে যে মানুষগুলো তিলে তিলে এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন, তাদেরই একজন শম্ভু আচার্যের কন্যা সেতু আচার্য। তিনি কেবল একজন শিল্পীর মেয়েই নন, ৪৫০ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের সার্থক উত্তরাধিকারীও বটে।
সেতু আচার্যের শৈশব কাটেনি প্লাস্টিকের খেলনা বা রঙিন রূপকথার বইয়ের পাতা উল্টে। তার খেলার সঙ্গী ছিল রঙ, তুলি, কাগজ আর চক। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমাদের খেলনা বা অন্যান্য অনুষঙ্গ বলতে ছিল রঙতুলি, কাগজ, চক—বাবা এগুলো দিয়ে দিতেন আর বলতেন, এগুলো নিয়ে খেলো। খেলতে খেলতেই শেখা।’
পারিবারিক পরিবেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ছিল না। বাবা শম্ভু আচার্য কখনো হাত ধরে শেখাননি, বরং ক্যানভাসের পেছনের রঙ করার দায়িত্ব দিতে দিতে অজান্তেই মেয়ের মনে বুনে দিয়েছিলেন শিল্পের বীজ। সেতু আচার্যের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চারুকলার ডিগ্রি নেই, কিন্তু তার কাছে শিক্ষালয় হলো খোদ ঘরটিই। তার ভাষায়, ‘আমার কাছে বাবাই একটা প্রতিষ্ঠান। অন্যসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু আমার মনে হয়, আমার স্কুল ঘরেই আছে। বাইরে যেতে হবে কেন? বাবাই আমার স্কুল, বাবাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়।’
নিজে যেভাবে খেলতে খেলতে, বাবার কাজ দেখতে দেখতে পটচিত্র শিখেছেন, সন্তানদের ক্ষেত্রেও সেই স্বাভাবিক শেখার পরিবেশই রাখতে চান সেতু আচার্য। আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকেই তারা এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হোক, এমনটাই তার প্রত্যাশা। সেতু চান, পটচিত্রের দীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকুক—কোনো বাধ্যবাধকতায় নয়, সহজাত আকর্ষণ ও নিজস্ব ইচ্ছায়।
সেতু আচার্যের মতে, পটচিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি এর দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত। এটি নিছক কল্পনানির্ভর কোনো শিল্প নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অতীত, মানুষের জীবনযাপন ও বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সুন্দরবনের কাহিনী থেকে শুরু করে পটচিত্রের নানা বিষয় নিয়ে গল্প আছে, পটের গান আছে। পটুয়া ও যারা এসব গান করেন, তাদের কাছে এ কাহিনীগুলো সংরক্ষিত আছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ ইতিহাস পৌঁছে দেয়া জরুরি। পটচিত্রে রঙতুলির মাধ্যমে সেই অতীতকেই জীবন্ত করে তোলা হয়, যাতে মানুষ জানতে পারে, একসময় আমাদের সমাজ ও গ্রামীণ জীবন কেমন ছিল।
তাই তার নিজের কাজেরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যেতে বসা অনুষঙ্গ তুলে ধরা। বায়োস্কোপ, বেদেদের সাপ খেলা, গ্রামের নারীদের পুকুর বা নদী থেকে পানি আনা, শাপলা তোলা কিংবা মাছ ধরার দৃশ্য—এসব তার ছবির বিষয়। যে জীবন একসময় বাংলার জনপদের পরিচিত দৃশ্য ছিল, তা এখন নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অচেনা। সেতু মনে করেন, এসব দৃশ্য ছবিতে তুলে ধরা জরুরি। কারণ শুধু মুখে বায়োস্কোপ বা সাপ খেলার কথা বললে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তা বুঝতে পারবে না। কিন্তু ছবির মাধ্যমে সেই হারানো জীবনকে দৃশ্যমান করা সম্ভব। তাই করে যাচ্ছেন তিনি।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশেষ কিছু কৌশলও। একসময় গামছার ওপর প্রলেপ দিয়ে ক্যানভাস তৈরি করা হতো। তার ঠাকুরদা ইটের গুঁড়িও ব্যবহার করতেন। প্রাকৃতিক উপাদান থেকে রঙ তৈরির ঐতিহ্যও তাদের পরিবারে রয়েছে। তবে ঢাকায় বসবাস করায় প্রয়োজনীয় উপাদান না পেয়ে সেতুকে অনেক ক্ষেত্রে বাজারের গুঁড়া রঙের ওপর নির্ভর করতে হয়। ঘরে পাওয়া কিছু উপাদান দিয়ে অবশ্য নিজেও রঙ তৈরির চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে তার আক্ষেপমিশ্রিত অভিব্যক্তি, ‘বাবার মতো পুরোপুরি প্রাকৃতিক উপায়ে রঙ তৈরি করতে পারি না। প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোও হাতের কাছে নেই।’
পটচিত্রের বাজার অত্যন্ত সীমিত। চাল-ডাল কিংবা পোশাকের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয় এটি; ফলে নিয়মিত বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। পটচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটা যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ, তা হাড়ে হাড়ে টের পান সেতু। তবে বাবার কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকারকে সেতু আচার্য সম্পত্তির চেয়েও মূল্যবান মনে করেন। তাই পারিবারিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার পাশাপাশি শিল্পের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা থেকেও এ কাজ নিয়ে এগিয়ে যেতে চান তিনি।