ভারতীয় চিত্রকলায় বর্ষা

মেঘ রাগে বর্ষার গান, নায়িকার অভিসার

রাগমালায় বর্ষার উপস্থিতি লক্ষণীয়। মেঘ রাগের সঙ্গে মিলিয়ে ছবিগুলো আঁকা হতো। এর কোনো কোনোটিতে আবার আছে কৃষ্ণের উপস্থিতি। রাধা-কৃষ্ণের মিলন আকাঙ্ক্ষা, নীলাম্বরী পরে রাধার অভিসারে যাওয়া—এসব বিষয় নিয়েই ছবিগুলো

ঘোরত ঘণ ছাউ ওরা, ঘোষ নির্ঘোষিনী মাধি
ধরধর ধারা ধরনী মুষল ধারাবা জল চড়নী
ঝিল্লীগন ঝাকর, পবণ ঝুকি ঝুকি ঝক ঝক ঝরত
ঘোরতর বাদলে ছেয়েছে আকাশ, গর্জে ওঠে বিজলি
ধরনীর বুকে গগন থেকে ঝরঝর করে ঝরে জল
ঝিঁঝির ডাকের মতো বাতাসের শব্দের মতো ঝরে জল
—কবিপ্রিয়া, কেশব দাস

ইউটিউবে রবীন্দ্রসংগীত সার্চ দিলে অটো সাজেশনেই এখন আসে ‘বর্ষার গান’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক গানেই বর্ষা প্রসঙ্গ আছে। কবিতায়ও আছে। মধ্যযুগের কবিদের কবিতায় বসন্তের চেয়ে বর্ষার আলাপই ছিল বেশি। কেবল বাংলা নয়; হিন্দি, মারাঠি, মালয়ালম ভাষার কবিরাও বর্ষার কবিতা লিখেছেন। কালিদাস তো বিখ্যাত। একইভাবে ভারতের চিত্রকলায়ও আছে বর্ষার রূপ। শিল্পীরা তাদের তুলির আঁচড়ে, রঙের ব্যবহারে ক্যানভাসে-কাগজে ফুটিয়ে তুলেছেন বর্ষা। চিত্রকলার বিভিন্ন ধারাতেই এসেছে বর্ষা। এর মধ্যে রাগমালা, বারোমাস্যা, মিনিয়েচার, রাজপুত ঘরানা, কালিঘাটের পট থেকে আধুনিক চিত্রধারায়ও শিল্পীরা বর্ষার রূপ এঁকেছেন।

শুরু করা যাক রাগমালা দিয়ে। রাগ হলো সংগীতের অংশ। রাগমালা চিত্রকলা ভারতের মিনিয়েচার ধারার একটি অংশ। এতে সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি তৈরি করা হতো। এ ধারার চিত্রকলায় সংগীত, কবিতা ও চিত্রকলার মেলবন্ধন দেখা যায়। ভারতের প্রায় সব ঘরানা ও অঞ্চলের চিত্রকর্মেই রাগমালার উপস্থিতি দেখা যায়। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর রাজপুত, দক্ষিণী, পাহাড়ি ও মোগল রাগমালার নমুনা পাওয়া যায়। তবে এ ধারার সূচনা হয়েছিল রাজস্থানে।

রাগমালায় বর্ষার উপস্থিতি লক্ষণীয়। মেঘ রাগের সঙ্গে মিলিয়ে ছবিগুলো আঁকা হতো। এর কোনো কোনোটিতে আবার আছে কৃষ্ণের উপস্থিতি। রাধা-কৃষ্ণের মিলন আকাঙ্ক্ষা, নীলাম্বরী পরে রাধার অভিসারে যাওয়া—এসব বিষয় নিয়েই ছবিগুলো। একটি ছবিতে কৃষ্ণকে দেখা যায়। হাতে বাদ্যযন্ত্র। তিনি রাগ মেঘ বাজাচ্ছেন এবং তাকে বেষ্টন করা নারীরা সেই রাগ শুনছে—এমনটাই আঁকা হয়েছে। ছবিতে মিনিয়েচারের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ছবির ওপরের অংশ পুরোটাই কালো মেঘে আবৃত।

রাজস্থানের রাগমালার আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, কৃষ্ণ তার গোপীদের নিয়ে গোবর্ধন পর্বতের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। বৃষ্টির বিরুদ্ধে ছাতার মতো ব্যবহার হচ্ছে গোবর্ধন পর্বত। জয়পুরের এ ছবিটি কালি, ওপেক ও জলরঙে আঁকা। স্বর্ণের ব্যবহারও আছে। তবে শিল্পীর নাম মেলে না।

জয়পুর রাগমালা ঘরানার আরেকটি ছবিতে রাধা ও কৃষ্ণকে দেখা যায়। কৃষ্ণ একটি ছাতার নিচে রাধাকে বেষ্টন করে নিয়ে কোথাও যাচ্ছেন। তাদের পিছু নিচ্ছে একটি গাই। ঘন কালো মেঘের পটে এ ছবিতে নীল কৃষ্ণ ও সুসজ্জিত রাধাকে দেখা যায়।

মেঘমালা ঘরানার মধ্যে কিছু শাখা আছে। এর মধ্যে জয়পুর ঘরানার কথা আলোচিত হলো। এছাড়া আছে কাঁড়া ঘরানা, বাসোলি ঘরানা ও কোটা-বুন্দি ঘরানা। এর মধ্যে কাঁড়া ঘরানার একটি ছবির উল্লেখ করা প্রয়োজন। মোগল ঘরানার শিল্পী মোলা রামের স্টাইলে অঙ্কিত ছবি ‘অভিসারিকা নায়িকা’। এতে বনমাঝে এক নারীকে দেখা যায়। তার পরনে লাল ঘাঘরা, নীল দোপাট্টা। ঘন বনের পটে ওপরে আকাশে কালো মেঘের মাঝে বিজলির চমকে ওঠা চিত্রিত হয়েছে। একে রাধা মনে করা যেতে পারে, আবার যেকোনো প্রেমিকাকেও ধরে নেয়া যায়, যে বর্ষা রাতে প্রিয় মিলনে অভিসারে গেছে।

এসব ধারায় যে কেবল রোমান্টিক ছবিই অঙ্কিত হয়েছে, এমন নয়। শিকার, যাত্রার ছবিও আছে। আরো আছে রাজকুমার, রাজাদেরও ছবি। এর মধ্যে কুমার দ্বিতীয় অমর সিংয়ের একটি ছবি বেশ আলোচিত ও বিখ্যাত। এতে একটি ছাতা মাথায় কুমারকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। এছাড়া রাজপুত চিত্রকলার মধ্যে বর্ষার ছবির অন্যতম সেরা ছবিটি শিবলালের আঁকা। আনুমানিক ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে আঁকা এ ছবিতে দেখা যায়, মহারানা ফতেহ সিং ও তার দলবল ঘোড়ায় চড়ে একটি নদী পার হচ্ছেন। ছবিতে যেমন নদী ও লোকালয় আছে, তেমনি ছবির পটে আছে সবুজ পাহাড়। যদিও ঝুম বৃষ্টি এ ছবিতে স্পষ্ট। আকাশে আছে বিজলির চমক।

তবে এ ধারার চিত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়। ছবিগুলোতে বিজলি বা বজ্রপাত আঁকা হয়েছে অনেকটা সাপের সদৃশ করে। বিজলির রঙ নীল নয়, কিছুটা কমলা-হলুদ।

মোগল মিনিয়েচারে বর্ষার উপস্থিতি খুব বেশি না। তবে অভিসারিকা নায়িকা মোগল ঘরানার চিত্রকর্মেরই উদাহরণ। এক্ষেত্রে মোলা রামের নামই ঘুরেফিরে আসে। তিনি অভিসারিকা নায়িকার একটি সিরিজ করেছিলেন রীতিমতো। ছবিগুলো মোগল মিনিয়েচারেরই অংশ। এর আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, নায়িকা বর্ষণমুখর দিনে তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। রীতিমতো সর্পসংকুল বনে তিনি অপেক্ষা করছেন প্রেমিকের।

মোগল ঘরানার বা মোগল স্টাইলের ছবি হলেও পাঞ্জাবের এ ছবি নতুন বা আলাদা ঘরানারই বলা চলে। ছবিতে একজন নারীকে দোলনায় দোল খেতে দেখা যায়। ১৭৫০-৭৫ সময়ে কাগজে জলরঙ ও স্বর্ণে অঙ্কিত ছবিটির পটভূমিতে বর্ষা বা বর্ষা মৌসুমের ছাপ স্পষ্ট।

বারোমাস্যা চিত্রকলার ছবিগুলো মোগল মিনিয়েচার, রাজস্থানী চিত্রকলা থেকে আলাদা করা কিছুটা কঠিন। অনেক বৈশিষ্ট্যই মিলে যায়। তবে সূক্ষ্ম ও স্পষ্ট কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ ছবিগুলোর ফিনিশিং তুলনামূলক অ্যামেচার (দেখতে)। এছাড়া বারোমাস্যা বিভিন্ন অঞ্চলের হয়। বাঙালি বারোমাস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে ভোজপুরি, হিন্দি বারোমাস্যাও। এ ধারায়ও বেশির ভাগ ছবির মূল চরিত্র রাধা ও কৃষ্ণ।

পরবর্তী সময়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসুর মতো বাঙালি চিত্রকর বর্ষার ছবি এঁকেছেন। তারা আধুনিক ধারার চিত্রকলাকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। তাদের পথরেখা অনুসরণ করে পরবর্তীকালের শিল্পীরাও এঁকেছেন। সে তালিকা অনেক দীর্ঘ। তবে ভারতের চিত্রকলায় যে বর্ষা একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে, তা স্পষ্ট।

আরও