প্রদর্শনী

প্রাচীন দলিলের গায়ে বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে ফুটে আছে ইতিহাস

দলিল বলতেই মাথায় আসে জমি বা কোনো সম্পত্তি কেনাবেচার চুক্তি। আদতেও বিষয়টা তাই।

দলিল বলতেই মাথায় আসে জমি বা কোনো সম্পত্তি কেনাবেচার চুক্তি। আদতেও বিষয়টা তাই। কোন সম্পত্তি কে কিনল, কার থেকে কত টাকায় কিনল তার নথিই দলিল। নানা রকম দলিল থাকে। সম্পত্তির মূল্য বিবেচনায় স্ট্যাম্প পেপারে লেখা হয় দলিল। অবশ্য দলিল অনেক ক্ষেত্রে সময়কেও ধরে রাখে। কোনো সময়, পরিবার বা ব্যক্তির ইতিহাস খুঁজতে গেলে সে কাজে সহায়তা করে দলিল। কিন্তু এবার দলিল হাজির হলো অন্যরূপে। কেননা দলিলে দেখা যাচ্ছে বাংলা ক্যালিগ্রাফি।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে চলছে একটি নতুন প্রদর্শনী। বেশ আগ্রহজাগানিয়া একটি বিষয় নিয়ে করা হচ্ছে প্রদর্শনীটি। এ আয়োজনে প্রদর্শিত হচ্ছে ত্রিশের বেশি দলিল। তবে তা কোনো সাধারণ দলিল না বা বলা যায় সাধারণ দলিলকেই ভিন্নরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি দলিলের ওপরই আছে চিত্রকর্ম। কোনোটা বাঘের, কোনোটা মানুষের। কিন্তু সেগুলো নিছক চিত্রকর্ম না। এগুলো তৈরি করা হয়েছে বাংলা ক্যালিগ্রাফি দিয়ে।

প্রদর্শনীর এ শিল্পকর্মগুলো শিল্পী আরহাম-উল-হক চৌধুরীর। আরহাম-উল-হক চৌধুরী একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী শিল্পী, ক্যালিগ্রাফার, ভাস্কর ও গবেষক। তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে তার সৃজনধর্মী কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়েছে সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিবেশের প্রতি গভীর সংযোগ। নৃবিজ্ঞান বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এ শিল্পী বাংলা ক্যালিগ্রাফি, ধাতব ভাস্কর্য, প্রাকৃতিক রঙের বাটিক ও নকশানির্ভর শিল্পকর্মে বিশেষভাবে প্রশংসিত।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়। প্রদর্শনীর নাম ‘দলিলে দৃশ্যপট: প্রাচীন দলিলে বাংলা ক্যালিগ্রাফি’। প্রদর্শনীটি চলবে ২৬ এপ্রিল প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। প্রতিদিনই দর্শক আসছে তাদের চেনার বাইরে ভিন্ন ধারার এ দলিল দেখতে।

লা গ্যালারিতে দেখা মিলল দলিলগুলোর। দেয়ালে ফ্রেমবন্দি একেকটা দলিলে একেক রকম চিত্র। পুরনো দলিলের মলিন হয়ে আসা কাগজ উঁকি দিচ্ছে ফ্রেমের ভেতর থেকে। কোনোটি ইংরেজিতে লেখা দলিল তো কোনোটা বাংলায়। একটা দলিলের লেখা প্রায় আবছা। তবে বেশির ভাগই পড়া যায়। সময় নিয়ে পড়তে হয়। কেননা ফ্রেমে পড়া আলোর কারণে চোখ ধাঁধিয়েও যায় একেক সময়। আর লেখার ধাঁচটাও পুরনো। হাতের লেখার স্ট্রোকগুলো দলিল লেখকের নিজস্ব।

আট আনা দামের একটি স্ট্যাম্পে আরহাম এঁকেছেন বাঘ। বাঘ শব্দটি দিয়েই ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে তিনি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আদল ফুটিয়ে তুলেছেন। দুরন্ত হিংস্র বাঘকে দেখা যায় সেখানে। আবার বাঘের উপযুক্ত বাঘিনীর ছবিও তিনি এঁকেছেন। সেখানে বাঘিনীকে বাঘের সঙ্গে রোমান্টিক আবহে দেখা যাচ্ছে। দলিলটি আট আনা কোর্ট ফির। দলিলটি উনিশ শতকের।

Decorated Deeds বা দলিলে দৃশ্যপট শিরোনামের এ প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে ৩১টি বাংলা ক্যালিগ্রাফি চিত্রকর্ম, যা রচিত হয়েছে দুর্লভ প্রাচীন দলিলের ওপর। কয়েকটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ঔপনিবেশিক আমলের দলিলও এতে অন্তর্ভুক্ত। এখানে প্রাচীন বাংলার প্রবাদ-প্রবচন ও ভাষার শৈল্পিক রূপ দলিলের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ভাষা ও স্মৃতিকে একসূত্রে গেঁথে রাখে।

শুধু বাঘ আর বাঘিনী নয়। শিল্পী এঁকেছেন জাল তোলার দৃশ্য। দুই আনা দামের স্ট্যাম্পের একটি দলিলের ওপর তিনি জালের দৃশ্য এঁকেছেন। জীবনে যে একবার হলেও জাল তুলেছে বা মাছ ধরার পর পুকুর থেকে জাল তোলার দৃশ্য দেখেছে সে বিষয়টি বুঝতে পারবে। তার চেয়েও চমৎকার বিষয়টি হলো এ দলিলের লেখা অস্পষ্ট। দেখে মনে হয় জাল থেকে চুইয়ে পড়া পানির কারণে লেখাগুলো মুছে গেছে।

কলের পুতুল এ সময় কয়জন চেনে? কিন্তু আরহাম তার ক্যালিগ্রাফিতে এ জিনিসও রেখেছেন। হয়তো নতুন প্রজন্মকে চেনানোর জন্যই তিনি এটা করেছেন। আট আনার একটি স্ট্যাম্পে তিনি সাহেবি আমলের একজন মানুষের আদল (সম্ভবত কোম্পানির সৈন্য) ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই সঙ্গে এ প্রদর্শনীতে থাকা দলিল ও চিত্রকর্মে কোম্পানি আমল থেকে শুরু করে তার আগে-পরে বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাস ধরা থাকল।

প্রদর্শনীটি বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে এবং আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার সঙ্গে শিল্পীর ৩০ বছরের সম্পর্ককে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।

আরও