প্রদর্শনী

বিশ্বাস ও আচারের এক ভিন্ন জগৎ

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে ঢুকে সামনে তাকালে মনে হবে একটা সৌরজগৎ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সুতার সঙ্গে ঝুলছে অনেক পিঁড়ি।

হঠাৎ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামল। তার সঙ্গে দমকা হাওয়া। আমাদের শহুরে জীবনে হয়তো বিষয়টা রোমান্টিক। কিন্তু উপকূলের মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়ে। এ বুঝি দমকা হাওয়া পরিণত হলো ঝড়ে, তারপর ঝড় থেকে জলোচ্ছ্বাস। কী করা যায়? তারা শরণ নেন পুরনো আচারের। একটা পিঁড়ি পেতে দেন দাওয়ায়, কিংবা ছুড়ে দেন উঠানে। ওতে বসবেন পবনদেব, জিরিয়ে শান্ত হবেন—এমনই বিশ্বাস সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের। এমন অনেক বিশ্বাস তাদের আচারে পরিণত হয়েছে। সে মানুষগুলোর জীবনাচার, বিশ্বাস আর সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন শিল্পী মণি মাঝি। এসব নিয়েই তার একক শিল্প প্রদর্শনী ‘নন-ডুয়ালিটি’ বা ‘অদ্বৈত’।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে ঢুকে সামনে তাকালে মনে হবে একটা সৌরজগৎ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সুতার সঙ্গে ঝুলছে অনেক পিঁড়ি। সেগুলো এমনভাবে সাজানো যেন একটা সৌরজগৎ। অবশ্য তার মাঝে কোনো সূর্য নেই। কাছে এগিয়ে পিঁড়িগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় এগুলো নিছক পিঁড়ি নয়। প্রতিটি বহন করে সুন্দরবনের সংস্কৃতির নিদর্শন। একেকটি পিঁড়িতে খোদাই করা আছে একেকটি বিষয়। একটি পিঁড়িতে মাছ, কোনোটিতে হয়তো হরিণ। একাধিক প্রাণী ও বৃক্ষ খদির পিঁড়িও দেখা যায়।

পিঁড়িগুলো সুন্দরবনের প্রাণী ও প্রাণের পরিচয়। খোদাই করে যেমন সেসব আঁকা হয়েছে, তেমনি আছে আরেক ধরনের বিশেষ উপস্থাপন। পিঁড়ির ওপর বসানো আছে সুতা দিয়ে তৈরি কিছু নকশা। যেমন একটিকে দেখলে স্পষ্টভাবেই শঙ্খ বলে চিহ্নিত করা যায়। মুখে ফুঁ দিয়ে বাজানো শাঁখ যে আকৃতিতে আমাদের পরিচিত, এটি সে আকারের। আরো দুই-তিন ধরনের আকার আছে। আবার কখনো দর্শকের মনে হতে পারে শ্বাসমূল দেখছেন।

প্রাণের পাশাপাশি আছে সংস্কৃতিও। কিছু পিঁড়িতে খোদাই করা আছে কয়েকটি লাইন, কয়েকটি কথা। একটি পিঁড়িতে লেখা ‘ভয় ও ভক্তি’। সুন্দরবনের মানুষ নানাভাবে ভয়ের সঙ্গে বাঁচে। একদিকে বাঘের ভয়, অন্যদিকে ঝড় বন্যার। তাই তারা কখনো বনবিবি, কখনো গাজী পীর আর কখনো দক্ষিণ রায়ের শরণাপন্ন হয়। সে বিষয়টি দেখা যায় একটি পিঁড়িতে। সেখানে লেখা—শিরনি দিবে গাজীর নামে, রায়েরে দিবে পূজা।

মণি মাঝি তার ‘অদ্বৈত’ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমি এমন এক ভূদৃশ্যের সন্তান, যেখানে নদী, বন-বৃক্ষ আর মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। সুন্দরবনের নদী, জোয়ার-ভাটা, মাটি, লোনাপানি, প্রাণী, মিথ ও লোকবিশ্বাস আমাকে শিখিয়েছে অস্তিত্ব মানে পারস্পরিক নির্ভরতা, স্মৃতি ও সম্পর্কের অবিরাম প্রবাহ।’

নিজের স্মৃতি থেকে মণি মাঝি সুন্দরবনের মানুষ ও জীবনাচারকে পুনরাবিষ্কার করেছেন এবং তাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন তার কাজের মাধ্যমে। অদ্বৈত নিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ টিকে থাকা শুধু মানুষের একার কাজ না। তার সঙ্গে সর্বপ্রাণের আত্মার একটা একত্মবোধ থাকে। ভারতীয় পুরাণে অদ্বৈতবাদ আছে, কিন্তু আমার কাজের ক্ষেত্রে আমি এটা পেয়েছি আমার ভূমি থেকে। সবাই মিলেমিশে থাকার যে আকুতি ও আচরণ সেটাই এখানে এসেছে। আমাদের এ সময় হয়তো মানুষ একাই বাঁচতে চায় বা বাঁচতে পারে বলে মনে করছে। এক্ষেত্রে ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স থাকে না। ব্যালান্সটা দেখা যায় আমাদের প্রান্তিক মানুষের জীবনে। যেখানে প্রকৃতি আর মানুষে ভেদ নেই।’

ভেদ নেই ধর্মের ক্ষেত্রেও। সেখানে যিনি পীর তিনিই আবার ঠাকুর। অভেদের এ গল্প পিঁড়িতে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। একটি পিঁড়িতে দেখা যায়, ‘ওরে পবন ঠাকুর, ওরে পবন পীর/ বাড়ি-ঘর ছেড়ে তুই নদীর ওপারে ফির।’

মণি মাঝি জানাচ্ছেন সুন্দরবনের সংস্কৃতি ও লোকাচারে যিনি পবন ঠাকুর তিনিই পবন পীর। ঝড় উঠলে প্রথমে তাকে পিঁড়ি পেতে দেয়া হয়, তাতেও শান্ত না হলে তাকে দেয়া হয় শিরনি। যারা পীরের থানে শিরনি দেয়, তারাই আবার পূজা দেয় দক্ষিণ রায়ের। যিনি বনবিবি, তিনিই হয়তো বনদুর্গা। এসব বিষয় তিনি তুলে এনেছেন ৪১টি পিঁড়িতে। পিঁড়িগুলো সুন্দরবনের বিভিন্ন পরিবার থেকে সংগ্রহ করা।

এছাড়া অদ্বৈতয় আছে কিছু বুননের কাজ। একটি ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে সুন্দরবনের নদীকে তুলে ধরা হয়েছে। আছে সবুজের উপস্থাপনও। দেয়ালের ঝোলানো কাপড়ে তাকিয়ে হয়তো দর্শকের মনে হবে তিনি সবুজের একটা খণ্ডাংশ দেখছেন এখানে। পিঁড়ির চক্রে ঘুরে এসে সবুজের ছায়ায় গিয়ে তিনিও অদ্বৈত জগতের অংশ হয়েছেন।

আরও