ভ্যান গঘের শিল্পভাবনা

আলুর ভেতর কৃষক ও নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি

স্থিরচিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে ফুল, ফল, মূল্যবান পাত্র কিংবা বিলাসসামগ্রী বারবার শিল্পীদের আকৃষ্ট করেছে।

ক্যানভাসে কয়েকটি আলু। একটি মাটির পাত্র। নিচে কুঁচকে যাওয়া গাঢ় নীল কাপড়। প্রথম দেখায় রান্নাঘরের খুব সাধারণ একটি দৃশ্য। কিন্তু এ সাধারণের মধ্যেই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ খুঁজে পেয়েছিলেন কৃষকের জীবন, মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া খাদ্যের ইতিহাস।

স্থিরচিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে ফুল, ফল, মূল্যবান পাত্র কিংবা বিলাসসামগ্রী বারবার শিল্পীদের আকৃষ্ট করেছে। আপেল নিয়ে পল সেজানের কাজ যেমন শিল্পের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে, তেমনি সূর্যমুখী ভ্যান গঘের নামের সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সেই ভ্যান গঘই ক্যানভাসের কেন্দ্রে বসিয়েছিলেন আলুকে। কারণ তার কাছে সৌন্দর্য মানে শুধু আকর্ষণীয় চেহারা নয়; যে বস্তু মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তারও ছিল শিল্পমূল্য।

একটি আলু মাটির নিচে জন্মায়। কৃষক তা ফলান। মানুষের শ্রমে ঘরে আসে। রান্নাঘরে গিয়ে খাবারে পরিণত হয়। অর্থাৎ একটি আলুর মধ্যেই রয়েছে মাটি, কৃষি, শ্রম, খাদ্য ও মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। ভ্যান গঘ সে গল্পটিই দেখেছিলেন।

নেদারল্যান্ডসের নুয়েনেনে অবস্থানের সময় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ তাই ভ্যান গঘের শিল্পের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি আঁকেন তার বিখ্যাত ‘দ্য পটেটো ইটার্স’। অন্ধকার একটি ঘরে কৃষক পরিবারের সদস্যরা টেবিল ঘিরে বসে আলু খাচ্ছে। বাতির ক্ষীণ আলোয় দেখা যাচ্ছে ক্লান্ত মুখ ও শ্রমে শক্ত হয়ে যাওয়া হাত। ছবিটিতে কোনো আভিজাত্য নেই। নেই দামি পোশাক, বিলাসী খাবার কিংবা সাজানো ঘর। আছে দিনের পর দিন মাটিতে কাজ করা মানুষের জীবন।

ভ্যান গঘ মনে করতেন, কৃষকের ছবি আঁকতে হলে সেই জীবনের বাস্তবতাকেই তুলে ধরতে হবে। কৃষকের শরীর, ঘাম, ধোঁয়া, খাবার সবকিছুই ছবির অংশ। তার কাছে শিল্পকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন ছিল না।

আলুকে ভ্যান গঘ এমনভাবে আঁকতে চেয়েছিলেন, যাতে কেবল বাহ্যিক নয়, বস্তুগত অস্তিত্বও অনুভব করা যায়। নুয়েনেনের ছবিটি আঁকার সময় ভাই থিওকে লেখা চিঠিতেও তিনি সবজিটির ওজন ও কঠিনত্বকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার কথা জানিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি অনুভূতি তৈরি করা, যাতে দর্শক আলুগুলোকে শুধু চোখে না দেখে যেন এর ভারও অনুভব করতে পারেন।

আলুগুলো নিখুঁত নয়। কোথাও খসখসে, কোথাও দাগযুক্ত, কোথাও অসমান। কিন্তু এ অসম্পূর্ণতাই যেন ছবিটির সৌন্দর্য। কারণ ভ্যান গঘ কোনো বাজারের ঝকঝকে আলু আঁকতে চাননি। তিনি আঁকতে চেয়েছেন মাটি থেকে উঠে আসা আলু। তার খোসায় যেন কৃষকের হাতের ছাপ।

১৮৮৬ সালের শেষভাগ থেকে ১৮৮৭ সালের শীতকাল। ভ্যান গঘের শিল্পীজীবনে পরিবর্তনের সময়। ভাই থিওর সঙ্গে থাকার সময় ভ্যান গঘের চারপাশে বদলে গিয়েছিল দৃশ্যপট। নেদারল্যান্ডসের গ্রামীণ জীবন থেকে তিনি এসে পড়েছেন ইউরোপের শিল্পচর্চার অন্যতম কেন্দ্র প্যারিসে। নতুন শিল্পী, নতুন রঙ, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুই তাকে প্রভাবিত করছিল। তবে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় শীতকাল। চারপাশে নেই পছন্দের ফুল। কী নিয়ে তাহলে আঁকবেন?

সমাধান মিলল ঘরের মধ্যেই। রান্নাঘর থেকে একটি মাটির পাত্র এবং কয়েকটি আলু নিয়ে তিনি সেগুলো সাজালেন। পাত্রের চারপাশে ছড়িয়ে দিলেন আরো কিছু আলু। নিচে বিছিয়ে দিলেন গাঢ় নীল কাপড়। এ সামান্য আয়োজনই হয়ে উঠল একটি স্থিরচিত্রের বিষয়। আঁকলেন তার বিখ্যাত ছবি ‘স্টিল লাইফ উইদ পটেটোস’। কয়েকটি আলু, অথচ তার ভেতর যেন ধরা পড়ে শিল্পীর পুরো এক সময়ের মানসিক ও নান্দনিক যাত্রা।

এবার বদলে গেছে চেহারা। হলুদ পাত্র, নীল কাপড়, উজ্জ্বল আলু—রঙের বৈপরীত্য স্পষ্ট। দৃষ্টিকোণও অস্বাভাবিক। নুয়েনেনের গাঢ় ও মাটির কাছাকাছি রঙের তুলনায় এটি অনেক বেশি প্রাণবন্ত।

পরে গবেষণায় পাত্রটির ধরনও শনাক্ত করা হয়। এটি ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভ্যালোরিসে তৈরি ‘প্যারিসিয়েন’ ধরনের মৃৎপাত্র। গবেষকদের ধারণা, থিওর প্যারিসের বাসার রান্নাঘরেই এমন পাত্র ছিল। অর্থাৎ ছবিটির জন্য কোনো অভিজাত বস্তু সংগ্রহের প্রয়োজন হয়নি। ভ্যান গঘ তার চারপাশের দৈনন্দিন জীবন থেকেই নিয়েছিলেন শিল্পের উপাদান।

নুয়েনেনে আলু ছিল কৃষকের জীবন ও শ্রমের প্রতীক। প্যারিস ও পরবর্তী সময়ে সে আলুই হয়ে উঠল রঙ, আলো, দৃষ্টিকোণ ও তুলির পরীক্ষার মাধ্যম। একটি সাধারণ বস্তু কীভাবে শিল্পীর বিবর্তনের সঙ্গে নতুন অর্থ পেতে পারে, তারও যেন উদাহরণ হয়ে উঠল আলু।

আরও