প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানবমনের অন্তর্দ্বন্দ্ব

ক্যাফে পেরিয়ে লা গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই দেখা যায় খোলা বইয়ের মতো তিনটি জানালা। প্রতিটি পাল্লায় দুটো করে ছবি।

মানুষের এক জীবন যেন যন্ত্রণার নামান্তর। সে যন্ত্রণা বয়ে যায়। কখনো প্রকাশ করে। প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে গান, কবিতা ও চিত্রকর্ম। সম্প্রতি চিত্রকর্মের মাধ্যমে অন্তর্দহন প্রকাশ করেছেন শিল্পী আবু কালাম শামসুদ্দিন। সেই সঙ্গে যুক্ত করেছেন প্রকৃতি ও দর্শন। তিনি তার চিত্রে ব্যক্তির প্রকৃতির সেতু তৈরি করেছেন, দর্শনের তত্ত্বের আধিক্য না রেখে নিজের কল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে তা উপস্থাপন করেছেন ক্যানভাসে। এ সবকিছু নিয়ে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে চলছে আবু কালাম শামসুদ্দিনের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘যন্ত্রণার গান: অরিষড়বর্গ’।

ক্যাফে পেরিয়ে লা গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই দেখা যায় খোলা বইয়ের মতো তিনটি জানালা। প্রতিটি পাল্লায় দুটো করে ছবি। সেখানে ছবির চরিত্রটি নিজের ভেতরকার যন্ত্রণা প্রকাশ করছে। এ ছবিগুলোর শিরোনাম ‘থিমস অব অ্যাগোনি: সেলফ রিফ্লেকশন’। ক্যানভাসের ওপর অ্যাক্রিলিকে আঁকা ৪০ দশমিক ৬৪ বাই ৩০ দশমিক ৪৮ সেন্টিমিটারের ছবিগুলো দর্শককেও যেন চিৎকার করে উঠতে বলে। তার নিজের মধ্যে থাকা দহনকে টেনে বের করতে চায়।

‘সংস অব অ্যাগোনি: অরিষড়বর্গ’ (যন্ত্রণার গান: অরিষড়বর্গ) নিবিড়ভাবে দেখলে একজন দর্শক প্রদর্শনীর ছবিগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারবেন। একদিকে আছে ‘থিমস অব অ্যাগোনি: সেলফ রিফ্লেকশন’। এ সিরিজে চিত্রকর নিজের মুখ ও ফিগার দিয়েই নিজের সঙ্গে মানুষের যন্ত্রণা তুলে ধরেছেন। এ সিরিজের কিছু ছবি অ্যাক্রিলিকে আঁকা, আর কিছু ছবি কাগজে কলমের কালিতে। স্কেচগুলোর কিছু দেখে মনে হবে তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করছে চরিত্রটি, কখনো সে ভাবছে, কখনো মোহপাশে নিজে জড়িয়ে আছে।

ভারতীয় দর্শন বলে, মানুষের মধ্যে ছয়টি রিপু আছে—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। ছবিগুলোতে শিল্পী মানুষের এ প্রবৃত্তিগুলোই তুলে এনেছেন।

কিন্তু রিপু নিয়েই কেন কাজ করলেন। এমন প্রশ্নের উত্তরে আবু কালাম শামসুদ্দিন বলেন, ‘অনার্স প্রথম বর্ষে থাকার সময় কোর্স টিচারের কাছে প্রথম ষড়রিপুর ব্যাখ্যা শুনি। তার আগে ষড়রিপুর কথা জানতাম, কিন্তু উপলব্ধিতে ছিল না। জানার পর জীবনের অনেক কিছু যথাযথ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পেয়েছি। আমাদের ভেতর তো অনেক কিছুরই চাহিদা ও তাগিদ থাকে। কিছু আমরা করতে পারি, কিছু পারি না। এ বিষয়গুলো প্রকৃতিই আমাদের ভেতরে দেয়। আমার কাজের মাধ্যমে সেই বিষয়গুলোই এক্সপ্লোর করতে চেয়েছি।’

গ্যালারির দেয়ালে থাকা ছবিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ফিগারগুলোয় অনেক শেকড়সদৃশ কিছু লাইন ব্যবহার করেছেন শিল্পী। তিনি জানান, এগুলো মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে প্রকাশ করে। প্রতিনিয়ত প্রকৃতি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষত গাছের সঙ্গে মানুষের নিয়মিত আদান-প্রদান চলে। অদৃশ্য সেই সম্পর্কও অন্বেষণ করেছেন শিল্পী।

মানুষের আদি অবস্থা থেকে আজ অবধি সে বয়ে চলেছে যন্ত্রণা। শিল্পী সেই যাত্রাও রেখেছেন তার চিত্রকর্মে। প্রদর্শনীতে থাকা চিত্রকর্মের একটি সিরিজ ‘দ্য ল্যামেন্ট’স মেলোডি: বার্থ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। এ সিরিজে মানুষের সূচনাকালকে তুলে ধরা হয়েছে। শিল্পী বলেন, ‘ষড়রিপু পৃথিবীর সব ধর্ম, মত, পুরাণেই কোনো না কোনোভাবে আছে—কোথাও ছয়টা, কোথাও সাতটা, বেশি বা কম। আমি এগুলোর মধ্যে মিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। আর দেখেছি মানবজাতির শুরু থেকে এখন অবধি রিপু মানুষকে প্রভাবিত করেছে। তাই মানবজন্মের শুরু থেকে এখন অবধি সময়টাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বার্থ অব ওয়ার্ল্ড সেই সূচনাবিন্দু, আর আমার ফিগার দিয়ে তার বর্তমান অবস্থা প্রকাশ করছি।’

প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রদর্শনীটি ছবির পাশাপাশি ব্যবহার করেছে ইনস্টলেশনও। একটি দরজা, কয়েকটি জানালা দিয়ে বোঝানো হয়েছে কীভাবে দহন ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চাইলে দরজা খুলে দেয়া যায়, চাইলে বন্ধ করা যায়। সব মিলিয়ে ‘যন্ত্রণার গান’ দেখায় মানুষের রিপু, তার বিবর্তন ও প্রকৃতির সঙ্গে তার সংযোগ। আর সবশেষে মনে হবে, খোলা বা বন্ধ ঘরে দ্বন্দ্ব প্রতিধ্বনিত হয়। তাই হয়তো শিল্পী এঁকেছেন ‘ইকোস অব ইনার কনফ্লিক্ট’।

আরও