আকাশ মাটি জল

প্রকৃতির পাঠে সাত নারীর নিজস্ব ভাষা

একই বিষয়কে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে শিল্পীদের প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে ভিন্নতা

প্রকৃতিকে দেখার চোখ সবার এক নয়। একই আকাশ কারো কাছে ঋতুর স্মৃতি, কারো কাছে রঙের বিস্তার। একেকজনের অনুভবের ভেতর দিয়ে প্রকৃতি পায় ভিন্ন ভাষা। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় অনুভব ও নিজস্ব শিল্পভাষা নিয়ে রাজধানীর ভূমি গ্যালারিতে চলছে সাত নারী শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনী ‘আকাশ মাটি জল’। একই বিষয়কে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে শিল্পীদের প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে ভিন্নতা—কারো ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকের রঙ, কারো কাজে কাগজ ও কলম, কেউ বেছে নিয়েছেন উডকাট, আবার কেউ ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন প্রকৃতি, স্মৃতি ও অনুভূতির নিজস্ব পাঠ। প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া শিল্পীরা হলেন জ্যোৎস্না মাহবুব, মণিদীপা দাশগুপ্ত, মুক্তি ভৌমিক, নার্গিস আক্তার পুনম, ফাহমিদা এনাম কাকলী, জেসমিন আক্তার ও হোসনে আরা ঝর্না। তাদের কাজের মধ্যে মাধ্যমের এ বৈচিত্র্যই প্রদর্শনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

প্রদর্শনীর ভাবনাটি এসেছে শিল্পীদের নিজেদের আলোচনার মধ্য থেকেই। শরৎকাল, প্রকৃতি ও চারপাশের অস্থির সময়—সব মিলিয়ে তারা এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চেয়েছেন, যেখানে দর্শক কিছু সময়ের জন্য দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে পারেন। শিল্পীদের ভাষায়, ‘আকাশ মাটি জল’ শুধু প্রদর্শনীর নাম নয়; এটি মানুষের নিজের জন্য তৈরি করে নেয়া একটি ‘ব্রিদিং স্পেস’ও।

প্রকৃতিকে ঘিরে এ ভিন্ন অনুভবেরই আলাদা রূপ দেখা যায় শিল্পীদের কাজে। প্রদর্শনীতে জ্যোৎস্না মাহবুবের উডকাট ছাপচিত্রের একটি কাজে উঠে এসেছে করোনাকালের বাস্তবতা। ২০২২ সালে তৈরি এ কাজে ঝরে পড়া পাতার মধ্য দিয়ে মহামারীতে সৃষ্ট শূন্যতা ও বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি। তবে সেই বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রকৃতির স্বাভাবিক চলমানতা যে থেমে থাকেনি—পাখি গান গেয়েছে, আকাশে উঠেছে চাঁদ। কাজটির ভাবনা প্রসঙ্গে শিল্পী বলেন, ‘করোনায় সব ঝরে পড়ে গেল, শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে আছি। পাখি গান গায়, তবু চাঁদ ওঠে। মূলত ঝরে পড়ার বেদনা আর জীবনের অব্যাহত চলার এ দ্বৈত অনুভবই কাজটিতে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি।’

অন্যদিকে নার্গিস আক্তার পুনমের শিল্পচর্চার মূল জায়গা সুফিবাদ হলেও ‘আকাশ মাটি জল’ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে তিনি ল্যান্ডস্কেপে মনোযোগ দিয়েছেন। তার কাজের ল্যান্ডস্কেপও গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও বিশেষ কিছু স্থানের সঙ্গে গভীর সংযোগ থেকে। ঝিনাইদহের নবগঙ্গা, সুন্দরবন কিংবা গ্রামবাংলার নদী-খালে কাটানো সময় এবং সেসব স্থানের অনুভব তার কাজে ফিরে এসেছে নানা রূপে। তার ভাষায়, ‘আকাশ মাটি জলের তো নির্দিষ্ট কোনো সীমানা থাকে না, প্রকৃতির প্রতি, মানুষের প্রতি আমার যে প্রেম তারই প্রকাশ ঘটে আমার ক্যানভাসে।’

মাধ্যমের দিক থেকেও আলাদা হয়ে উঠেছেন মুক্তি ভৌমিক। অন্য শিল্পীরা যেখানে চিত্রকর্মের মাধ্যমে তাদের ভাবনা ও অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন, সেখানে তিনি উপস্থাপন করেছেন ভাস্কর্য। এ ত্রিমাত্রিক মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে তার শৈশবের স্মৃতি—বৃষ্টি, পদ্মপুকুর, পাখি কিংবা অবাধ চলাফেরার সেইসব দিন। নিজের কাজের প্রসঙ্গে মুক্তি ভৌমিক বলেন, ‘আমার প্রত্যেকটা কাজের মডেল কিন্তু আমি নিজেই। আমি মূলত জীবনের সেই সময়টাকে তুলে ধরতে চাই যখন মানুষ খুব স্বাধীন থাকে, স্বপ্নে বিভোর থাকে। খুব সহজ ভাষায় আমি কাজগুলোকে উপস্থাপন করি, যেন যেকোনো শ্রেণী-পেশার মানুষ আমার কাজের ভাষাটা বুঝতে পারে।’

ভূমি গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা সাইফুর রহমান লেনিনের দৃষ্টিতে এ আয়োজনের গুরুত্ব শুধু শিল্প প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, ‘শিল্পীকে শিল্পী হিসেবেই উপস্থাপন করি, পুরুষ বা মহিলা সেটা নয়।’ একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের একসঙ্গে দেখার মধ্য দিয়ে সময়ের পরিবর্তনও ধরা পড়ে। সাইফুর রহমান লেনিনের ভাষায়, ‘একটা প্রদর্শনীতে গেলে মানুষের চিন্তার জায়গা অনেক বিস্তার লাভ করে—দর্শক উপলব্ধি করে আমি তো কখনো এভাবে ভাবিনি, যেভাবে এ ছবিতে একজন শিল্পী ভেবেছেন।’

আকাশ মাটি জল তাই শুধু প্রকৃতির দৃশ্যের প্রদর্শনী নয়। এখানে প্রকৃতি কখনো স্মৃতি, কখনো শৈশব, কখনো হারিয়ে যাওয়া শহরের বিপরীতে দাঁড়ানো সবুজ, আবার কখনো নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার পথ। ভিন্ন মাধ্যম ও ভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের চোখে একই আকাশ, মাটি ও জল শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে সাতটি আলাদা পৃথিবীর গল্প।

আরও