প্রথমে সেটিকে কুয়াশা মনে হলেও কয়েক মুহূর্ত পর স্পষ্ট হয়, এটি আসলে মশা নিধনের জন্য ধোঁয়া ছড়ানোর দৃশ্য। নগরজীবনের অত্যন্ত পরিচিত অথচ এ বাস্তবতাকে শিল্পের ভাষায় নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন শিল্পী রাগা রহমান। ‘মশা মারার জন্য কামান দাগা’ শিরোনামের কাজটিতে প্রামাণ্যচিত্রধর্মী ধারণ ও মঞ্চায়িত পারফরম্যান্স—দুই ধরনের উপাদানের সমন্বয় ঘটেছে।
মশা নিধনের জন্য ফগিংয়ের দৃশ্যগুলো পুরো একটি মহল্লাকে ধোঁয়ায় ঢেকে দিয়ে তৈরি করে স্বপ্নময়, প্রায় অতিবাস্তব এক পরিবেশ। একই সঙ্গে সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধ, প্রতিরোধ এবং অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চিত্রকল্প। অন্যদিকে, মার্শাল আর্টস প্রভাবিত গতিবিধির মাধ্যমে মশা মারার বৈদ্যুতিক র্যাকেটটি রূপ নেয় মৃতদের সঙ্গে যোগাযোগের এক প্রতীকী মাধ্যমে। ফগিং মেশিন ও র্যাকেট—দুটিই যেন এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। নগরজীবনের একেবারে সাধারণ একটি অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন নান্দনিক ও দার্শনিক সম্ভাবনা আবিষ্কার করার মধ্যেই ধরা পড়ে শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য।
রাগা রহমানের এ কাজসহ তার সাম্প্রতিক শিল্পচর্চা নিয়ে লালমাটিয়ার কলা কেন্দ্রে চলছে সাত দিনব্যাপী প্রদর্শনী ‘অবিদিত অনুরাগ’।
স্থিরচিত্র, ভিডিও ও প্রামাণ্যচিত্রের সমন্বয়ে নির্মিত এ প্রদর্শনী নগর ও প্রাকৃতিক জগতের মধ্যকার সূক্ষ্ম টানাপড়েনকে অনুসন্ধান করে। একই সঙ্গে এটি মানবদেহ, নগর ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতাকেও সামনে নিয়ে আসে। প্রদর্শনীর একাধিক স্থিরচিত্রে উঠে এসেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ জনঘনত্বসম্পন্ন শহরগুলোর একটি ঢাকা, যেখানে ছাদ এখনো শান্তি ও প্রশান্তির বিরল আশ্রয়গুলোর মধ্যে অন্যতম।
ছাদের বাগান শুধু খাদ্য উৎপাদন বা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এগুলো নগরের কোলাহল, যানজট ও ব্যস্ততার বিপরীতে একেকটি ক্ষুদ্র মরূদ্যান। শিল্পী দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ছাদ থেকে মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ করেছেন। ওপর থেকে দেখা সেই দৃশ্যগুলো যেন অসংখ্য ক্ষুদ্র জানালার মধ্য দিয়ে অন্যের জীবনের ক্ষণিক ঝলক দেখার অভিজ্ঞতা। অনেকটা বাস্তব জীবনের ‘Where’s Waldo?’ খেলার মতো, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে নতুন কোনো গল্প, নতুন কোনো আবিষ্কার।
প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে গাছ ও মানুষের সম্পর্কের অনুসন্ধান। এ অনুসন্ধান শুধু স্থিরচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, ভিডিও ও প্রামাণ্যচিত্রেও উঠে এসেছে উদ্ভিদ ও মানুষের মধ্যকার আন্তঃপ্রজাতিগত যোগাযোগের প্রশ্ন। এখানে গাছ কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়, বরং এক গল্পকার। একই সঙ্গে এটি সত্য, স্মৃতি ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবেও উপস্থিত। আত্মকল্পনাভিত্তিক আখ্যান, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক বয়ান পরস্পরের সঙ্গে মিশে নির্মাণ করেছে বহুমাত্রিক এক শিল্পভাষা, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সমষ্টিগত স্মৃতি একে অপরের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত হয়েছে।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান মনে করেন, সমকালীন শিল্পচর্চায় বহুমাধ্যমিকতা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, ‘এক্সিবিশনে অনেক ধরনের মিডিয়া থাকা দরকার। শুধু ভাবনা প্রকাশের জন্য খাতা-কলম যথেষ্ট নয়। নতুন প্রজন্ম এখন মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত। দর্শক যেমন বদলেছে, শিল্পীরাও তেমনি নিজেদের ভাবনা প্রকাশে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করছেন। এ প্রদর্শনীতে স্থিরচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের সমন্বয় তারই একটি নিদর্শন।’
শিল্পী সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ‘রাগা রহমানের ব্যক্তিগত পরিচয় ও শিল্পচর্চার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জার্মানিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে নিজের পরিচয় নিয়ে তিনি একধরনের দ্বৈত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার অনুভূতি ও চিন্তার গভীরে জায়গা করে নিয়েছে, যা তার শিল্পকর্মে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও চিন্তার সূত্রকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত তার শিল্পকর্মগুলো তার পরিচয়বোধের প্রতি গভীর আস্থা এবং বিশ্বজ্ঞান সম্পর্কে তার বিস্তৃত ও আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছে। বিষয়টি আমাদের মুগ্ধ করেছে।’
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত রাগা রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জার্মানিতে। বর্তমানে তিনি একাডেমি অব ফাইন আর্টস লিপজিগে অধ্যয়নরত। তার শিল্পচর্চা মূলত গবেষণানির্ভর। তবে সেই গবেষণা প্রচলিত একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
নিজের কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার গবেষণা কেবল একাডেমিক অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং গল্প, ধারণা, দৃশ্যচিত্র এবং অন্যান্য ভিজুয়াল শিল্পকর্ম সংগ্রহ ও অন্বেষণের মধ্য দিয়ে আমি চিন্তার উপাদান খুঁজে পাই এবং সেগুলোকেই ভাবনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি।’
ফলে রাগা রহমানের শিল্পকর্মে গবেষণা তথ্যের পুনরাবৃত্তি না ঘটিয়ে রূপ নিয়েছে অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, পরিচয় ও পর্যবেক্ষণের এক জটিল অথচ সংবেদনশীল শিল্প ভাষায়। ‘অবিদিত অনুরাগ’ সেই ভাষারই এক গভীর ও মননশীল প্রকাশ।