খবরগুলোতে নজর করলে দেখা যায় দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদেরও চিত্রকর্ম স্থান পায় নিয়মিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিলামে দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের শিল্পকর্ম ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। এ তালিকায় ভারতীয় আধুনিকতাবাদী শিল্পীরা আছেন, আবার তুলনামূলক কম আলোচিত শিল্পীদের নামও উঠে আসছে। মুম্বাই, নিউইয়র্ক ও লন্ডনে পরিচালিত নিলামঘরগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু রেকর্ড নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের কাজের প্রতি ক্রমবর্ধমান ও স্থায়ী চাহিদার সাক্ষী হচ্ছে।
রাজা রবি বর্মা
তালিকায় প্রথম নামটি আসবে রাজা রবি বর্মার। এ বছর এপ্রিলে রাজা রবি বর্মার ‘যশোদা অ্যান্ড কৃষ্ণ’ (আনুমানিক ১৮৯০ খ্রি.) ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে নতুন নিলাম রেকর্ড গড়ে। মুম্বাইয়ের স্যাফরন আর্ট নিলামে ছবিটি বিক্রি হয় ১৬৭ কোটি ২০ লাখ রুপিতে। শিল্পপতি সাইরাস পুনাওয়ালা কিনেছেন ছবিটি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কাজ করা রবি বর্মা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও পৌরাণিক ঐতিহ্যের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধ গড়ে তুলেছিলেন। ইউরোপীয় একাডেমিক চিত্রশৈলী এবং ভারতীয় আইকনোগ্রাফির সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।
এর আগে ২০২৩ সালে পুন্ডোলস মুম্বাইয়ে যশোদা ও কৃষ্ণবিষয়ক আরেকটি চিত্রকর্ম ৫০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে রেকর্ড গড়েছিল।
শান্তি দাভে
একই মাসে স্যাফরন আর্টের নিলামে শান্তি দাভের ‘দ্য গ্রুপ’ (১৯৬২) ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৭ ডলারে (১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার বেশি) বিক্রি হয়ে শিল্পীর নতুন নিলাম রেকর্ড গড়ে।
১৯৫৬ সালে গুজরাটে প্রতিষ্ঠিত পরীক্ষাধর্মী শিল্পীগোষ্ঠী ‘বরোদা গ্রুপ’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিল্পী শান্তি দাভে। চিত্রকলা ও ম্যুরাল উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সিদ্ধহস্ত। একাধিক স্তরে রঙ ব্যবহার, ঘন উপকরণ এবং বিমূর্ত অঙ্গভঙ্গিভিত্তিক এক স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক ও ফ্রাঙ্কফুর্টে এয়ার ইন্ডিয়ার অফিসের জন্যও তিনি বড় বড় কমিশনভিত্তিক কাজ করেছেন।
মীরা মুখার্জি
২০২৩ সালে পুন্ডোলস নিলামে মীরা মুখার্জির ‘পিলগ্রিমস টু হরিদ্বার’ (১৯৮৩) ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৯৩ ডলারে বিক্রি হয়, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এটি মীরা মুখার্জির কাজের ক্ষেত্রে রেকর্ড মূল্য।
ভারতীয় আধুনিক শিল্পে একসময় বিমূর্ততার আধিপত্য দেখা যায়। সে সময়েও মীরা মুখার্জি মানুষের জীবন ও শ্রমকে কেন্দ্র করে কাজ করেছেন। তিনি ধোকরা ধাতু ঢালাই পদ্ধতি ব্যবহার করে অসাধারণ সব ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন।
তার ‘আনটাইটেলড (হুইল বিল্ডার্স)’ চলতি মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ক্রিস্টি’জ-এর ‘সাবলাইম শ্যাডোজ: সাউথ এশিয়ান আর্ট ফ্রম আ ডিস্টিংগুইশড কালেকশন’ শীর্ষক নিলামে প্রদর্শিত হবে। এটি সাত বছরের মধ্যে শহরটিতে ক্রিস্টি’জ আয়োজিত দক্ষিণ এশীয় আধুনিক শিল্পকর্মের জন্য নিবেদিত প্রথম বিশেষ নিলাম। শিল্পকর্মটির সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মূল্য ১ লাখ ৭ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার (১ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি)।
নলিনী মালানি
১৯৪৬ সালে করাচিতে জন্ম নলিনী মালানির। নারী অধিকার, সহিংসতা, সামাজিক অবদমন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তার শিল্পচর্চার প্রধান বিষয়।
২০২৫ সালে তার ‘নার্সারি টেলস’ (২০০৭) ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ ডলারে বিক্রি হয়ে রেকর্ড গড়ে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫ কোটি টাকার বেশি। ২০২৪ সালে ক্রিস্টি’জ-এর নিলামে ‘লাভ’ (১৯৯০-৯১) বিক্রি হয়েছিল ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি।
২০২৭ সালে লন্ডনের টেট মডার্নে তার ছয় দশকের কর্মজীবন নিয়ে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।
বিবান সুন্দরম
ভারতীয় আধুনিক শিল্পের পথিকৃৎ অমৃতা শের-গিলের ভাতিজা বিবান সুন্দরম। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টলেশন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার কাজের নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে সদবি’জ-এর ‘মডার্ন অ্যান্ড কনটেমপোরারি সাউথ এশিয়ান আর্ট’ নিলামে তার ‘ইনবিটুইননেস’ (১৯৬৭) ৮ লাখ ৯৬ হাজার ডলারে (১১ কোটি টাকার বেশি) বিক্রি হয়ে শিল্পীর নতুন রেকর্ড গড়ে।
গণেশ পাইন
১৯৩৭ সালে কলকাতায় জন্ম নেয়া গণেশ পাইন দেশভাগ-পরবর্তী সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতার মধ্যে বেড়ে ওঠেন। তার দাদির মুখে শোনা লোককাহিনী এবং সেই অস্থির সময়ের স্মৃতি তার শিল্পে বারবার ফিরে এসেছে।
গত মার্চে তার ‘এনকাউন্টার ইন দ্য টোয়াইলাইট জোন’ (১৯৭৪) ২৫ লাখ ১ হাজার ডলারে (৩০ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বেশি) বিক্রি হয়।
রশীদ চৌধুরী
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি নির্মাতা রশীদ চৌধুরী। ঢাকা আর্ট কলেজে পড়াশোনার পর তিনি স্পেন ও ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং বিখ্যাত ট্যাপেস্ট্রি শিল্পী জ্যাঁ লুরসার কাছে প্রশিক্ষণ নেন।
২০২৬ সালের মার্চে সদবি’জ নিউইয়র্কের নিলামে তার ১৯৭৭ সালের একটি নামহীন ট্যাপেস্ট্রি ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ ডলারে বিক্রি হয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি।
বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যকে আধুনিক বিমূর্ত শিল্পভাষায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে তার অবদান অসামান্য। তার কাজ বর্তমানে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে রয়েছে।
শহিদ কবীর
গত বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশী শিল্পী শহিদ কবীরের তিনটি ছবি লন্ডনে সদবি’জ-এর একটি নিলামে বিক্রি হয়। ছবিগুলোর বিক্রীত মোট মূল্য ৫৩ হাজার ৩৪০ পাউন্ড, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৮৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। শহিদ কবীরের লালন পর্বের ১৯৭৮ সালে আঁকা ‘সাদা ঘোড়ার ওপরে লালন’, ১৯৭৯ সালে আঁকা ‘মসজিদ, লালন ও মন্দির’ ও ১৯৭৯ সালে আঁকা ‘কালের যাত্রামঞ্চ’ চিত্রকর্ম এ নিলামে তোলা হয়েছিল।
শহিদ কবীরের জন্ম ১৯৪৭ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের শিল্প পরিবেশে তিনি এমন একটি চিত্রভাষা উদ্ভাবন করেন, যা আধুনিক কৌশলকে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক থিমের মিলন ঘটায়। তিনি লালন ও বাউল পরম্পরা দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং অনুভূতিপূর্ণ সিরিজের মাধ্যমে খ্যাতি পান।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দক্ষিণ এশীয় শিল্পের এ উত্থান কেবল বাজারের পরিসংখ্যান নয়; এটি দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত শিল্পীদের পুনর্মূল্যায়ন, আঞ্চলিক ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার এবং বৈশ্বিক শিল্প মানচিত্রে উপমহাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরও প্রতিফলন।