একই নদীর জল যেমন প্রতিটি বাঁকে বদলে যায়, তবু তার প্রবাহের সঙ্গে থেকে যায় আগের স্রোতের স্মৃতি—শিল্পের যাত্রাটিও অনেকটা তেমন। এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরের প্রজন্মের কাছে এসে বদলে যায়, সে বদলে যাওয়া দৃষ্টি থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভাষা। স্মৃতি, সময় ও অভিজ্ঞতার এমনই এক চলমান সংলাপের সামনে দাঁড় করিয়েছে ভূমি গ্যালারির প্রদর্শনী ‘কন্টিনিউয়াম’।
ঢাকার লালমাটিয়ায় ভূমি গ্যালারিতে ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে তিন প্রজন্মের তিন বাংলাদেশী শিল্পী—সিদ্ধার্থ তালুকদার, কারু তিতাস ও নাজমুল হক বাপ্পীর ৬০টি শিল্পকর্ম। প্রত্যেক শিল্পীর ২০টি করে কাজ নিয়ে সাজানো এ আয়োজনের মাধ্যমে তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের ভিন্ন ভাষায় উঠে এসেছে সময়, মানুষ, প্রকৃতি ও সমকালকে দেখার তিন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রদর্শনীর জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের শিল্পী সিদ্ধার্থ তালুকদারের কাজের কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতি। তার প্রকৃতি কোনো সরল দৃশ্যপট নয়; পরিচিত প্রকৃতির ভেতর থেকেই তিনি খুঁজে নেন বিমূর্ত ফর্মের সম্ভাবনা। রঙ, রেখা ও টেক্সচারের বিন্যাসে তাই তার ক্যানভাসে প্রকৃতি কখনো দৃশ্যমান, কখনো আবার প্রায় বিমূর্ত এক অনুভূতিতে রূপ নেয়। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ‘সংস অব রেইন’ চিত্রকর্মে বৃষ্টির আবহ ফুটে উঠেছে রঙের স্তর ও টেক্সচারের মধ্য দিয়ে। জলরঙে আঁকা ‘ফ্লাওয়ার্স’ চিত্রে পরিচিত ফুল ও প্রকৃতির রূপ ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে শান্ত, অন্তর্মুখী এক দৃশ্যভাষা।
মধ্যবর্তী প্রজন্মের শিল্পী কারু তিতাসের কাজের কেন্দ্রে রয়েছে জনজীবনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপন, তাদের চলাফেরা, সংগ্রাম ও চারপাশের পরিচিত দৃশ্য তার ক্যানভাসে ফিরে আসে এক বিশেষ দৃশ্যভাষায়। সে জীবনকে তিনি সরাসরি বাস্তবধর্মী রূপে তুলে ধরেন না; আবার পুরোপুরি বিমূর্ততার দিকেও যান না। তার কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে সেমি-অ্যাবস্ট্রাক্ট বা আধা-বিমূর্ত ফর্ম। তাই তার ছবিতে মানুষের অবয়ব, রিকশা কিংবা কয়েকজন মানুষের উপস্থিতি সহজেই শনাক্ত করা যায়, কিন্তু সে চেনা ফর্মগুলো বাস্তবের হুবহু প্রতিলিপি নয়। রঙ, রেখা, ফর্ম ও টেক্সচারের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোকে তিনি নতুন এক বিন্যাসে হাজির করেন। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ‘স্মৃতির বিকেল’-এ শহরের রিকশা ও স্থাপত্যের অনুষঙ্গ যেমন চেনা যায়, তেমনি ‘জলজীবন’ চিত্রকর্মে প্রকৃতির রূপ, নদীমাতৃক জীবন ও গ্রামীণ আবহকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া ‘সোনালু’, ‘দিন প্রতিদিন’ কিংবা ‘জলরঙে বিচরণ ২’-এর মতো কাজেও বাস্তব ও বিমূর্ততার এ মধ্যবর্তী অবস্থানটি স্পষ্ট।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি নাজমুল হক বাপ্পির কাজে ঐতিহ্য ও সমকাল মুখোমুখি হয় নতুন অনুসন্ধানে। চীনা চিত্রকলার কৌশল ও নান্দনিকতা তার শিল্প ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তুলির প্রবাহ, সংযত রেখা, অল্প রঙ ও প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা তার কাজে এক ধরনের মুক্ত গতি তৈরি করে। ‘পয়েট্রি অব ওয়াটার অ্যান্ড বোটস’, ‘ফ্লোটিং’, ‘হুইসপিয়ারিং পিকস’, ‘রিভার বাউন্ড’ চিত্রকর্মগুলোয় চীনা চিত্র ভাষার সঙ্গে বাংলার চেনা প্রকৃতির এ মেলবন্ধন তার কাজে তৈরি করেছে এক স্বতন্ত্র আবহ, যেখানে পরিচিত দৃশ্যপটও যেন নতুন করে ধরা দেয়। তার ছবিগুলো দর্শকের সামনে এনে দেয় এক নতুন, সতেজ ও রিফ্রেশিং অনুভূতি।
তিন শিল্পীর পথ আলাদা, তাদের দেখার চোখও আলাদা। কেউ প্রকৃতির ভেতর খুঁজেছেন বিমূর্ততার ভাষা, কেউ জনজীবনের চেনা দৃশ্যকে ভেঙেছেন নিজস্ব ফর্মে, আবার কেউ দূরদেশের চিত্র ভাষাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে তাকিয়েছেন বাংলার প্রকৃতির দিকে। তবু তাদের কাজের ভেতর দিয়ে একটি স্রোত অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত—সময়কে দেখা, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এবং সেই বদলের সাক্ষ্য রেখে যাওয়া। সে অর্থে ‘কন্টিনিউয়াম’ কেবল তিন প্রজন্মের শিল্পীদের পাশাপাশি উপস্থাপন নয়; এটি শিল্পের উত্তরাধিকার কীভাবে এক হাত থেকে আরেক হাতে গিয়ে বদলে যায়, অথচ তার অন্তর্গত স্রোতটি অটুট থাকে, তারই দৃশ্যমান পাঠ। অতীত এখানে থেমে নেই, বরং নতুন প্রজন্মের চোখে নতুন রূপ নিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে।