চিত্রকর্মে প্রতিবিম্বিত ঈদ

মানবসভ্যতা বিভিন্ন সময়েই তাদের জীবনাচারকে চিত্রকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। মুসলমান সমাজও ব্যতিক্রম ছিল না। যখন বাগদাদ, কর্ডোভা, ইস্তানবুল, দিল্লি ও ঢাকা পরিণত হয়েছিল মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে।

সামনে চলছেন সম্রাট। তাকে অনুসরণ করছেন সন্তানেরা। তাদের পেছনে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা, সাম্রাজ্যের উজির-নাজির এমনকি সৈন্যরাও। হাতি, ঘোড়া, উট ও নানা কিসিমের পরিবহন নিয়ে অতিকায় সমারোহ কোনো যুদ্ধের জন্য না, ঈদের জন্য। সে সময়ে ঈদের দিন সকালেই শাসক সবাইকে নিয়ে বের হতেন আনন্দ মিছিলে। মোগল শাসনের শুরু থেকেই এই চর্চা ছিল। এ চিত্রকর্মে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে মোগল আমলের সে ঈদ উৎসবকে। চিত্রকর্মটি তৈরি করা হয়েছে দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের সময়, যার শাসনকাল ছিল ১৮০৬-৩৭ খ্রিস্টাব্দ। অর্থাৎ মোগল শাসন তখন অবক্ষয় যুগ পার করছে। অথচ সেই অবক্ষয়ের চিহ্ন যেন মিছিল দেখে বোঝার জো নেই। বরং ঈদ বলতে যে আনন্দ বোঝায়, তা চিত্রকর্ম থেকে স্পষ্ট।

ঈদের দিন সম্রাট বাবর।

মানবসভ্যতা বিভিন্ন সময়েই তাদের জীবনাচারকে চিত্রকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। মুসলমান সমাজও ব্যতিক্রম ছিল না। যখন বাগদাদ, কর্ডোভা, ইস্তানবুল, দিল্লি ও ঢাকা পরিণত হয়েছিল মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে। ঈদ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় উৎসব। ফলে বিভিন্ন সময়ের চিত্রকররা চিত্রকর্মেও তুলে এনেছেন ঈদ প্রসঙ্গ। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর নিজে ঈদ উদযাপন নিয়ে বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন তার আত্মজীবনী বাবরনামায়। তিনি জানান, সামরিক কারণে তাকে গুরুত্বপূর্ণ এ উৎসব ভিন্ন ভিন্ন স্থানে উদযাপন করতে হয়েছে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে নিজের অবস্থান পোক্ত হওয়ার পর বাবর ঈদ উদযাপন করেন জৌলুসের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তার গ্রন্থ অবলম্বনে তৈরি হয়েছে চিত্রকর্ম। এক পেইন্টিংয়ে দেখা যায় সম্রাট জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর ঈদের অতিথিদের সঙ্গে দেখা করছেন।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের ঈদ উদযাপন

সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীর নাম তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী। বইটিতে রমজান ও ঈদ উদযাপন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। এ সময়ে সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রথা ও আচার মোগল ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। জাহাঙ্গীর বর্ণনা করেন সিংহাসন ছেড়ে ইদগাহের পথে যাওয়া ও জনতাকে উপহার দেয়ার কথা। ঈদগাহে কাটানো সময়ের পর তিনি প্রাসাদে ফিরে এসে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সদকা করতেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি আদেশ দিয়েছিলাম দান ও খয়রাতে অর্থ ব্যয় করা হোক। আমি ৫ হাজার রুপি শাইখ মুহাম্মদ হুসাইন জামির দরবেশদের কাছে পাঠাই এবং নির্দেশ দিই যে প্রতিদিন পাহারার একজন কর্মকর্তা ৫০ হাজার দাম ফকিরদের মধ্যে বিতরণ করবেন।’ জাহাঙ্গীরের সেই উৎসবমুখর ঈদও পরবর্তী সময়ে সংরক্ষিত হয়েছে চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে।

উসমানি আমলে ঈদ উদযাপন অনেকটাই মোগলদের কাছাকাছি ছিল। বিভিন্ন সময়ে লেখা ইউরোপীয় পর্যটকদের লেখায় ফুটে উঠেছে উসমানি সাম্রাজ্যের ঈদ উদযাপন। এ রকম একটি উদাহরণ ইংরেজ সামরিক কর্মকর্তা চার্লস হোয়াইট (১৭৯৩-১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ১৮৪৪ সালে তার অতিকায় কর্ম ‘থ্রি ইয়ার্স ইন কনস্ট্যান্টিনোপল’ রচনা করেন। সেখানে ইস্তানবুলে বসবাস করা অবস্থায় ঈদে উদযাপনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তার কাছে ঈদকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছে তখন। তিনি জানান, জনসমক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময়, কঠোর সংযম ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে পালিত হয় ঈদ। হাতে হাত স্পর্শ হয় পারস্পরিক শুভেচ্ছার প্রতীক হিসেবে। আমরা ইংরেজরা এটাকে সংযমের অংশ হিসেবে অনুকরণ করতে পারি। অন্য একজন পর্যটক ফ্রান্সিস হার্ভে (১৭৮১-১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ) জানান, যখন ঈদ আসে, তখন চারদিকে মুখর হয়ে ওঠে। সবার চোখে মুখেই থাকে আনন্দ, গায়ে থাকে নতুন জামা। অনেকে ভাবতে পারে, তুর্কিরা তাদের সন্তানদের একটু বেশি করে সাজায়। কিন্তু আমি জানি, যখন একটা তুর্কি পরিবারে জাহাজে ঘোরাঘুরি কিংবা সাজগোজ করে ঘোরাফেরা করে, তার চেয়ে মুগ্ধকর কোনো দৃশ্য নেই।’

ঈদের দিনে তৎকালীন জাফা নগরী। ছবি: তুর্কি টুডে

ঈদের দিন সকালে তোপকাপি প্রাসাদ থেকে বের হতো মিছিল। এ রকম একটা মিছিল দেখা যায় ১৮০০ সালের দিকে উসমানি আমলের চিত্রকর্মে। উসমানি আমলের বেশকিছু চিত্রকর্মে ঈদ উদযাপন করতে দেখা যায়। ঈদে ঢাক-ঢোল নিয়ে মানুষ জমায়েত হতো, সামরিক বাহিনী বের করত দীর্ঘ শোভাযাত্রা। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে দীর্ঘ বাজার, কেনাকাটা ও বিচিত্র সব খেলাধুলার আয়োজনও ঠাঁই পেত। তবে একটা চিত্রকর্ম বেশ দাগ কাটার মতো। ফিলিস্তিন তখন উসমানি শাসনের অধীনে। আজকে যে নগরীটি তেল আবিব নামে পরিচিত, তার নাম ছিল জাফা। ১৮৭০ সালের ১৬ এপ্রিল আঁকা ফরাসি একটি ম্যাগাজিনে দেখা যায় জাফায় ঈদ উদযাপন। ফিলিস্তিন বর্তমানে বিপর্যস্ত, ফিলিস্তিনি জীবনে হাসির ঠাঁই নেই। অথচ সেই ছবিতে উঠে এসেছে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছ্বাস ও আনন্দ।

ঢাকায়ও একসময় মহাসমারোহে পালিত হয়েছে ঈদ। সুলতানি আমল থেকেই ঈদের দিন বের হতো মিছিল। ঢাকার প্রথম শাহি ঈদগাহ নির্মাণের সময় ১৬৪০ সাল। সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার অমাত্য মীর কাশিম নির্মাণ করেছিলেন ধানমন্ডির ঈদগাহ। এসব ঈদগাহে জামাতে আসতেন সুবা বাংলার সুবাদার, নায়েবে নাজিম ও তাদের পরিষদেরা। ঈদের দিন সকালে দিল্লি কিংবা ইস্তানবুলের মতো ঢাকায়ও বের হতো মিছিল। তেমনই একটা মিছিল দেখা যায় চিত্রকর্ম।

আরও