সৃষ্টি করতে পারেন নতুন কোনো শিল্পভাষা। তবে সাধারণ দর্শকের কাছে গল্পটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। রাজধানীর উত্তরার সেন্টার পয়েন্টের ভূমি গ্যালারিতে চলছে চিত্র প্রদর্শনী ‘পারসিস্টেন্স’। এ প্রদর্শনীতে দেয়ালে সাজানো চিত্রকর্মগুলোয় গল্প, তত্ত্ব, দর্শন সবই আছে। তবে গ্যালারির গঠন, ছবির বিন্যাস ও প্রদর্শনীর আয়োজন একত্র হয়ে গল্পটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি দৃষ্টিভঙ্গি, সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে নতুন একটি ধারার।
দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী পারসিস্টেন্স। সিনিয়র শিল্পীদের পাশাপাশি আছে তরুণদের প্রতিনিধিত্বও। সে কারণেই বৈচিত্র্য লক্ষিত হয় ক্যানভাসে। কোনোটিতে খুঁজে পাওয়া যায় গল্প, কোনোটিতে অসাধারণ কম্পোজিশন, কোনোটি মনে করিয়ে দেয় স্মৃতি, কোনোটি আবার জাদুবাস্তবতার স্বাদ দেয়।
শিল্পী আবদুল্লাহ আল বশির ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে এঁকেছেন ল্যান্ডস্কেপ। গ্যালারিতে ঢোকার মুখেই তার একটি ছবি দেখা যায়। ‘ইনফিনিটিভ ওয়ান’ নামের পাহাড়ের দৃশ্যটি ৮০×৪২ ইঞ্চি। বিস্তৃত ছবিটি এক বৃহৎ ব্যঞ্জনা তৈরি করে। তার ‘ইনফিনিটিভ টু’ আরো বড়, ৯৬×৪৮ ইঞ্চি। অন্যদিকে ‘ডেনসিটি’ দেখায় এ শহরে আমাদের ঘিঞ্জি জীবনের বাস্তবতা। ঘন দালানের জঙ্গলের ওপরে হাঁড়িবন্দি গোল্ডফিশ আমাদের স্মরণশক্তিকে প্রশ্ন করে। ‘ডেনসিটি’ ও ‘ইনফিনিটিভ’ সিরিজ দুটি মূলত বিপরীত দুই অবস্থা ও অবস্থান প্রকাশক।
গ্যালারিতে প্রবেশের পর হাতের ডান দিকে মোড় নিলে পরপর সাজানো আছে শিল্পী ফরিদা জামানের ‘সুফিয়া’ সিরিজ। হলুদ, নীল ও শ্যামলের কম্পোজিশনে ‘সুফিয়া অ্যাট নাইট’; লাল, হলুদ ও সাদার মধ্যে সুফিয়া, নৌকা ও জাল নিয়ে ‘সুফিয়া অ্যান্ড ফিশিং নেট’; নীল ও হলুদে ‘সুফিয়া উইথ হার লোনলি মুড’সহ আছে আরো কয়েকটি ছবি। ‘সুফিয়া’ সিরিজের বাইরে আছে ‘ফিশিং নেট অ্যাট নুন’। ‘সুফিয়া’ সিরিজ মূলত আবহমান নারীকে উপস্থাপন করে। সেই সঙ্গে উপস্থাপন করে বাংলাদেশকে। সুফিয়ার সঙ্গে যুক্ত নদী ও জাল তারই উপস্থাপনা। পারসিস্টেন্সে থাকা সুফিয়ার বেশকিছু ছবি ৪৮×৪৮ ইঞ্চির, কিছু এর চেয়ে বড় ও ছোটও আছে।
শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস তার ক্যানভাসে রঙ নিয়ে খেলেন। বিভিন্ন রঙ দিয়ে তিনি উপস্থাপন করেন মানুষের মন, চিন্তা, পরিবেশ, প্রকৃতি ও অন্যান্য বিষয়। ১০৮×৪২ ইঞ্চি আকারের তার ‘স্টোরি অব আ ওয়াল’ একটি উদাহরণ। ছবিটি দেখলে রঙচটা, স্যাঁতসেঁতে একটি দেয়ালের কথা মনে হয়। একে মেলানো যেতে পারে মানুষের মনের সঙ্গেও। ছবিটির সঙ্গে তুলনায় আসবে ‘ফ্রম নেচার’। ৮৪×৩৬ ইঞ্চির এ কম্পোজিশনে সবুজ, নীল, কালো রঙের ব্যবহার প্রকৃতিকে তুলে ধরেছে। তবে ‘দ্য সাইলেন্ট ক্রসিং’ ভাবনার অবকাশ রেখে যায়। এছাড়া নজর কাড়ে ‘ইমেজ ফাইভ’ ও তিনটি কম্পোজিশন।
ঢেউ নেই, মাটি নেই; কিন্তু সমুদ্র ও বেলাভূমি চিহ্নিত করা যায় তরুণ ঘোষের ‘লেট আফটারনুন’ ছবিটিতে। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিটিতে একটি বাতিঘর দেখা যাবে। পড়ন্ত বিকালের এ ছবি নস্টালজিয়া তৈরি করে। অন্যদিকে ভাবনার অবসর তৈরি করে দেয় ‘আনটোল্ড’। হলুদ, সাদা ও ছাই রঙের মধ্যে না বলা গল্প খুঁজে নিতে পারেন দর্শক। আবার তার ‘রোড টু হ্যাভেন’ একটি স্পষ্ট ও সহজ গল্প বলে। একজন দর্শক সহজেই প্রকৃতি ও ফেলে আসা সময়কে দেখতে পারবেন ৬০×৩৬ ইঞ্চির এ ছবিতে। তবে তরুণ ঘোষের ‘গার্ডেন অব হ্যাভেন’ তার ‘রোড টু হ্যাভেন’-এর তুলনায় জটিল বোধ তৈরি করে।
শিল্পী জামাল আহমেদ তার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ছবি আঁকতে পছন্দ করেন। ৭২×৪৮ ইঞ্চির ‘গোয়িং হোম’ একদিকে যেমন পায়রার বাড়ি ফেরার চিত্র, তেমনি ছবিটি হয়তো মানুষকেও ফিরতে বলে তার ঠিকানায়। ক্যানভাসে যা উপস্থিত নেই, সে বিষয়টিই মনে করানোর মতো বিষয় আছে তার ক্যানভাসে। যেমন ‘মনসুন’ ছবিটিতে বৃষ্টি স্পষ্ট নয়। কিন্তু কালো ছাতা ও নীলের পটভূমি ঘনঘোর বর্ষাকেই মনে করায়। ‘ওয়েটিং’ বা অপেক্ষা আরো চমৎকার একটি গল্প বলে। মা ও শিশু কারো অপেক্ষায় আছে। হয়তো শিশুটির বাবা গেছে মাছ শিকারে। তার ফেরার অপেক্ষাই অ্যাক্রিলিকে চিত্রিত করেছেন শিল্পী। সেই অপেক্ষা অন্য মাত্রায় আসে জলরঙে আঁকা ‘রিটার্নিং হোম’ ছবিতে।
সাদা জবা ফুল হয়তো অনেকে দেখেননি। কিন্তু দেখতে পারেন আহমেদ শামসুদ্দোহার ক্যানভাসে। অ্যাক্রিলিকে ৪৮×৪৮ ইঞ্চির ক্যানভাসে তিনি এঁকেছেন ‘ডেলিকেট হোয়াইট’। আবার রক্তজবাও আছে ‘স্টানিং রেড’-এ। তার ‘ব্লুম টু’ আবার কিছুটা জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া মাখানো। তবে ছবিগুলো (বিশেষত প্রথম দুটি) কোনো না কোনোভাবে জর্জিয়া ও’কিফির চিত্রকর্ম মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে ‘সুন্দরবন আফটার সিডর’-এ এলোমেলো উপকূল, ভাঙা গাছ ও নৌকা একটি সময়ের দলিল।
বৃষ্টি প্রকৃতিরই অংশ। সেই বিষয়ই এসেছে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা রোকেয়া সুলতানার ‘গ্রিন রেইন’ ছবিতে। টম জোনসের ‘গ্রিন গ্রিন গ্রাস অব হোম’ অনেকের শোনা থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। তবে সেই গানের সঙ্গে রোকেয়ার একই নামের ছবিটিকে মেলাতে পারেন। সংসদ ভবনকে পটভূমিতে রেখে তার ‘প্রাইড অ্যান্ড ডিগনিটি’ আমাদের দেশের গল্প। রঙ, কম্পোজিশন ও সাবজেক্ট মিলে ‘টাইম অ্যান্ড ম্যাডোনা’ হয়ে ওঠে একটি ক্ল্যাসিক উপস্থাপনা।
কনকচাপা চাকমা এঁকেছেন অ্যাক্রিলিক ও জলরঙে। তার ‘রিচুয়াল’ একদিকে প্রথার কথা বলে, ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ তীব্রভাবে শব্দ শোনায়, ‘শাইনিং দ্য লাইটস’ বলে উৎসব ও আশার গল্প। অন্যদিকে ‘প্রেয়ার হুইল’ ছবিটির দুটো ভিন্ন অংশ যেন দুটো স্রোতকে মিলিয়ে দিয়েছে।
তুলনামূলক জটিল গল্প আছে মোহাম্মদ ইকবালের ছবিগুলোয়। তিনি অ্যাক্রিলিক ও তেলরঙে এঁকেছেন। ‘হোলি সার্কেল’ সিরিজের মধ্যে গল্পটিকে খুঁজে নিতে হয়। ‘ডিস্ট্যান্ট স্কাইজ’ মনে করিয়ে দেয় আধুনিক জীবনের নানা জটিলতা ও দূরত্বকে। তবে শান্তির বার্তা পাবেন ‘পিস ইন দ্য টাইম অব ডিসকুইয়েট’ সিরিজের ছবিতে।
চার প্যানেলে তেলরঙে শহীদ কাজী এঁকেছেন ‘ওয়াটার লিলি অ্যাট বিল’ (১৪৪×৪৮ ইঞ্চি)। ছবিটি আমাদের জাতীয় ফুল, বিল ও প্রকৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। ‘সানফ্লাওয়ারস জাস্ট বিফোর রেইন’ও এ প্রকৃতিরই ছবি। তবে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা ছবিটি প্রকৃতির ভঙ্গুরতাকেও দেখায়। ‘থ্রি ফলেন সানফ্লাওয়ার’, ‘পিংক রোজ’ও একই রকম গল্প বলে।
ভূমি গ্যালারি পারসিস্টেন্সকে সাজিয়েছে একটা সার্বিক গল্প হিসেবে। মূল গ্যালারির বাইরে ফাঁকা জায়গা থেকেই শুরু হয়েছে প্রদর্শনী। সেখানে আলাদা স্থাপনা তৈরি করে ছবি সাজানো হয়েছে। ভেতরেও ছবি সাজানোর ক্ষেত্রে মাত্রা, স্পেস ও পরিসরকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ছবির সঙ্গে সাউন্ড সিস্টেমে বাজতে থাকা সংগীত এক আলাদা অনুভূতি জাগায়।
গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী সাইফুর রহমান লেনিন বলেন, ‘আমরা তো একটা অস্থির সময়ে বাস করছি। আমার মনে হয় শিল্পের মাধ্যমে স্থিরতা আনা সম্ভব। শিল্প মানুষকে স্থির করে। আমরা সে কারণেই এ প্রদর্শনী আয়োজন করেছি। পাশাপাশি সেন্টার পয়েন্টের মতো একটি স্থানে আয়োজন করার কারণ হলো জনপরিসরে শিল্পকে পৌঁছে দেয়া। এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসেন। তারা গ্যালারিও ঘুরে যাচ্ছেন। শিল্পও পৌঁছে যাচ্ছে এমন পরিসরে, যারা হয়তো একটা সময়ে শিল্পে আগ্রহী ছিলেন না। আমার মনে হয় শিল্পকে জনপরিসরে পৌঁছে দিতে আমাদের এ উদ্যোগ একটি নীরব বিপ্লবের মতোই।’