ধরা যাক, কয়েক বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা সারা বছর পিৎজা খাওয়ার একটা হিসাব রাখবেন। কে কত টাকা খরচ করেছে, তা ওই হিসাবে লিপিবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যে কাগজে খরচ লিখে রাখবেন, সেটা তো হারিয়ে যেতে পারে; কারো দ্বারা বিকৃত হওয়ার আশঙ্কাও আছে। এজন্য তারা এমন একটা নোটবুক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন, যেটার কপি সবার কাছেই থাকবে। সে নোটবুকে কেউ কোনো খরচ লেখার সঙ্গে সঙ্গে সেটার হালনাগাদ কপি সবাই পেয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে যেহেতু সবার কাছেই একই কপি থাকবে, তাই একজন চাইলেই কিছু মুছতে বা বদলাতে পারবেন না। এছাড়া টাকা দেয়নি বা পাইনি বলেও কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।
তথ্য বা হিসাব সংরক্ষণের এ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ব্লকচেইন বোঝা যেতে পারে। ব্যাংকসহ অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের ধারণা পাল্টে দিচ্ছে এ প্রযুক্তি। প্রযুক্তিবিদরা জানান, এ ব্যবস্থায় লেনদেনের তথ্য হারিয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কেউ চাইলে কোনো তথ্য মুছে ফেলতে কিংবা বিকৃতিও করতে পারবেন না।
ব্লকচেইনকে একটি ‘বিপ্লবী উদ্ভাবন’ হিসেবে দেখেন কানাডার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাবিষয়ক পরামর্শক ডন ট্যাপস্কট। তার ভাষায়, ‘ব্লকচেইন এমন একটা প্রযুক্তি, যেটা কোনো সত্তাকে বিশ্বাস করা ছাড়াই লেনদেনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এটি একটি আস্থাকে একটি কোডে রূপান্তর করে ফেলে।’
ব্লকচেইন প্রযুক্তির আরেকটি বিশেষত্ব হলো সার্ভারে একটি অক্ষর যোগ হলেও সেটি একটি দীর্ঘ শব্দমালায় রূপান্তর হয়ে যায়। এ শব্দমালা বিশ্লেষণ করে প্রকৃত শব্দকে কোনোভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কারণ সে শব্দমালা কাজ করে ‘হ্যাশ’ ফাংশনের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ‘হ্যাশ’ মূলত একটি ‘আইডেন্টিফায়ার’ বা পরিচিতি। প্রতিটি ‘হ্যাশ’ স্বতন্ত্র হয়। ফলে ব্লকচেইন সার্ভার কেউ হ্যাক করলেও কোনো গ্রাহকের গোপন তথ্য কিংবা কোনো লেনদেনের প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। এছাড়া ব্লকচেইনে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে লেনদেন করা যায়। এ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজনও নেই। ফলে লেনদেন হয় ‘রিয়েল টাইমে’।
বৈশ্বিক বাজার গবেষণা ও পরামর্শক সংস্থা প্রেসিডেন্স রিসার্চের আগস্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক ব্লকচেইনের বাজারমূল্য ছিল ১ হাজার ৭৬০ কোটি ডলার। ২০২৪-এ প্রযুক্তির বাজার দাঁড়াবে ২ হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে, যা ২০৩৪ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-৩৪ সাল পর্যন্ত বাজারের প্রবৃদ্ধির হার হবে ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ।
অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস (এডব্লিউএস) বলছে, প্রথাগত ডাটাবেজ সিস্টেম একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয়। একজন ব্যবহারকারী সে ডাটাবেজে নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে অ্যাকসেস করেন। এ ডাটাবেজের একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইউনিট থাকে, যা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ অ্যাডমিন চাইলেই ডাটাবেজে পরিবর্তন আনতে পারে। এখানে ব্যবহারকারীর হাতে কিছু করার নেই। কিন্তু ব্লকচেইন প্রযুক্তি যে উন্নত ডাটাবেজ সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তা একটি কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয় না। অর্থাৎ এ সিস্টেম বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতিতে কাজ করে।
একটি কম্পিউটার বা কেন্দ্রের পরিবর্তে একাধিক কম্পিউটারের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ফলে তথ্যের পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ ব্লকচেইন হচ্ছে অসংখ্য তথ্যের ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত চেইন। প্রতিটি ব্লকে তথ্য সংরক্ষিত থাকে। প্রতিটি ব্লক ক্রমান্বয়ে একটির পর একটি সংযুক্ত। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ব্লকচেইন শুরু করলে প্রথম যে তথ্য দিয়ে ব্লক তৈরি করতে হয় তাকে জেনেসিস ব্লক বলে। এরপর থেকে যখন ব্লক তৈরি হতে থাকবে, তখন প্রতিটি ব্লকে একটি করে কোড (হ্যাশ) থাকে। যার মাধ্যমে ওই ব্লক স্বতন্ত্র পরিচয় পায়। আবার একই সঙ্গে ব্লকগুলোয় আগের ব্লকের তথ্য (প্রিভিয়াস হ্যাশ) থাকে।
দ্রুতবর্ধনশীল ডিজিটাল বিশ্ব ভবিষ্যতে অনেক শিল্পে ব্লকচেইন প্রযুক্তির চাহিদা বাড়াবে বলে আশা করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। এছাড়া এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমগুলো আরো জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এডব্লিউএস বলছে, মিডিয়া জগতে বিশেষ করে কপিরাইট, তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ে স্বচ্ছতা আনতে ব্লকচেইন বেশ কার্যকর। এ প্রযুক্তিতে কনটেন্টের ক্ষেত্রে কপিরাইট হস্তান্তর খুব সহজ ও নিরাপদে করা যায়। সনি মিউজিক এন্টারটেইনমেন্ট বর্তমানে ব্লকচেইনের মাধ্যমে তাদের কাজ পরিচালনা করছে। ফলে তাদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং কপিরাইট প্রসেসিং ফিও কমেছে।