প্রথম পাতা

উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হয় মাত্র ৫% শিল্পে

বদরুল আলম | ২৩:৪০:০০ মিনিট, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

দেশে ওষুধ শিল্পের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও সমাদৃত। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত ক্যাপসুলের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৪ (০০০) পিস। যদিও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ২২ লাখ ১১ হাজার ৩১৩ (০০০) পিস। এ হিসাবে সক্ষমতার ৪৫ শতাংশ ছিল অব্যবহৃত। একই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটির ট্যাবলেট উৎপাদন সক্ষমতারও ৪১ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল।

দেশের ওষুধ শিল্প খাতের আরেক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ও সাপোজিটরি পণ্য উৎপাদন হয় সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে তরল ও মলম-জাতীয় ওষুধ উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহার করতে পেরেছে সক্ষমতার ৮০ শতাংশ।

দেশের ওষুধ শিল্পের বাজার ছাড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার বা ১৩ হাজার কোটি টাকা। দেশের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৮২ শতাংশই মেটানো হচ্ছে স্থানীয় কোম্পানির মাধ্যমে। এ খাতে সক্রিয় প্রতিষ্ঠান আছে দেড়শর বেশি।

এ প্রসঙ্গে ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিব এসএম শফিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, সক্ষমতার ব্যবহার একেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একেক রকম। কোনো প্রতিষ্ঠান ১০ কোটি ট্যাবলেট উৎপাদন করলেই হবে না, তা বিক্রিও করতে হবে। যেটা বলতে চাইছি তা হলো, বাজার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করলেই সক্ষমতার সঠিক ব্যবহার সম্ভব। মূলত চাহিদা ও সরবরাহের অসামঞ্জস্যের কারণে পূর্ণ সক্ষমতার ব্যবহার সম্ভব হয় না। এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের মতো অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে।

ওষুধ শিল্পই শুধু নয়, দেশের বৃহত্ শিল্পের অধিকাংশই উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের শিল্প খাতের মাত্র ৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে। যদিও এ-সংক্রান্ত জরিপটি বিবিএস চালায় চার বছর আগে ২০১২ সালে। চার বছর পর বর্তমান চিত্র কেমন, তা বুঝতে বিভিন্ন খাতওয়ারি অনুসন্ধান চালায় বণিক বার্তা। তাতে দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরে বেসরকারি খাতের চাহিদায় মন্দাগতি এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি সংকট এ অবস্থাকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে গেছে।

দেশে ৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প সিরামিক। এ খাতে উৎপাদনকারী সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০। খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন সূত্রমতে, ৫০টি শিল্পের কোনোটিই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। এ শিল্পের টেবিলওয়্যার উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। টাইলস উৎপাদনে ব্যবহার করা যাচ্ছে সক্ষমতার সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ।

বাংলাদেশ সিরামিক ওয়্যারস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইরফান উদ্দিন রিফাত বলেন, আমাদের শিল্পে শূন্য শতাংশ কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ সাধারণভাবে বলা যায়, এ খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহে ব্যর্থতা।

বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা বার্ষিক চার কোটি টন। আর দেশে প্রতি বছর সিমেন্টের চাহিদা আড়াই কোটি টনের মতো। চাহিদার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে এ খাতের ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের। যদিও এর মধ্যে খুব কম প্রতিষ্ঠানই উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. শহিদুল্লাহ বলেন, আমাদের ৩৩টি মানসম্পন্ন শিল্প-কারখানার মধ্যে ১০-১৫ শতাংশ তাদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে। সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে না পারার মূল কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব। পাশাপাশি পরিবহনজনিত সমস্যাও রয়েছে।

বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যপণ্য উৎপাদন শিল্প কাজে লাগাতে পারে সক্ষমতার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ও পানীয় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। বস্ত্র শিল্পে সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হয় ৩ শতাংশ ও পোশাক খাতে ১ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হয় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ও আসবাব খাতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে।

খাতসংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, দেশের ইস্পাতের বাজারের আকার ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো। সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের চাহিদাই মূলত এ খাতের সরবরাহ সচল রাখে। কারণ দেশে ইস্পাতের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ যায় সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থাকে এ শিল্পেও। বার্ষিক ৪০ লাখ টন চাহিদার এ শিল্পের উৎপাদন সামর্থ্য ৮০ লাখ টন। এ খাতে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি।

এ খাতের প্রতিষ্ঠানভেদে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ এখনো অব্যবহৃত থাকে। বিএসআরএমসহ অন্যান্য বৃহত্ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে জিপিএইচ, আরএসআরএম ও রহিম স্টিল। এ প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে স্টিলের কাঁচামাল উৎপাদন করে। বিএসআরএম, আবুল খায়ের স্টিল, কেএসআরএম— এ তিন প্রতিষ্ঠান দেশের স্টিলের মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ জোগান দেয়।

পুরো খাতের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, গত বছরের কিছুটা সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। এর প্রভাবে চাহিদা ঘাটতি দেখা দেয়। আবার বিগত বছরগুলোয় সরকারের বড় প্রকল্পগুলোর কাজ তেমন ছিল না। ফলে খাতটিতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়। তবে শিগগিরই এ অবস্থা কেটে যাবে। তার ভাষায়, ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান এ খাতে খুব বেশি হলে ১৫ শতাংশ।

দেশের বৃহত্ শিল্প খাতের অন্যতম সিমেন্ট, সিআর কয়েল, পাট ও তুলাজাত সুতা, চিনি, ভোজ্যতেল এবং চামড়া খাতের পরিধিও বড়। আর এ খাতগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে ঢের বেশি। বাড়তি এ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পণ্য রফতানির সুযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। রফতানি বাড়াতে অভাব রয়েছে সরকারের নীতিসহায়তারও। ফলে বৃহৎ এসব শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতার গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত বিনিয়োগ, দুর্বল অবকাঠামো, আর্থিক অব্যবস্থাপনাসহ একাধিক কারণে উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। আর উৎপাদনক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে না পারায় বিনিয়োগ নিয়ে এক ধরনের ঝুঁকি অনুভব করছেন তারা। এ ঝুঁকি সামাল দিতে গিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন শিল্প মালিকরা। তা সত্ত্বেও শিল্প সম্প্রসারণ হচ্ছে। তবে সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না।

সিআর কয়েল উৎপাদকদের সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, পণ্যটি উৎপাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানে এক মাসের উৎপাদনক্ষমতা ১৫ হাজার টন। যদিও বাজারে চাহিদা রয়েছে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টনের।

সিআর কয়েল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের কর্ণধার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘পণ্যটি উৎপাদনে প্রয়োজন হয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। অথচ অনেক সময়ই তা পাওয়া যায় না। মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ থাকলেও তাও সম্ভব হচ্ছে না।

সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে চিনি উৎপাদনক্ষমতা বার্ষিক ৩২ লাখ টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৬-১৭ লাখ টন। স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে চিনি রফতানির সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীন বছরে চিনি আমদানি করে ১৫ লাখ টন। বাংলাদেশে ১৫ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এর ৫০ শতাংশও যদি চীনে রফতানি করা যায়, তাহলে শিল্পটিকে টেকসই রূপ দেয়া সম্ভব।

পাটসুতা উৎপাদকদের সূত্রে জানা গেছে, খাতটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা ও উৎপাদনক্ষমতা বছরে ১০ লাখ টন। যদিও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার মিলে বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটসুতার চাহিদা এখনো সাড়ে ছয় লাখ টন। পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ করতে না পারায় মূল্য কমাতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। উৎপাদন সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।

তুলাজাত সুতা উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাবি, তুলা থেকে পোশাকের সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং খাতের উৎপাদনক্ষমতা ২০ লাখ টন। এর ৩০-৩৫ শতাংশ সবসময়ই অব্যবহৃত থাকছে। ফলে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

বিটিএমএর সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিন এ প্রসঙ্গে বলেন, কারখানার সক্ষমতার পুরোটা কখনই কাজে লাগানো যায় না। বেশির ভাগ সময়ই এ শিল্পে উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৩৫ শতাংশ অব্যবহৃত থাকে। বর্তমানে স্পিনিং কারখানাগুলোয় উৎপাদন আরো ৫-১০ শতাংশ কমেছে। পোশাক খাতের চাহিদা কমাসহ একাধিক কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের মতো জ্বালানি সংকট এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তিরও অভাব রয়েছে।

দেশে আরেক বড় খাত ভোজ্যতেল পরিশোধন। খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ৩০ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেল পরিশোধন হচ্ছে ১৪ লাখ টনের মতো। এ হিসাবে অব্যবহৃত রয়েছে উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশের বেশি। ভোজ্যতেল রফতানি বন্ধ থাকায় সক্ষমতার পুরোপুরি কাজে লাগাতেও পারছেন না এ খাতের উদ্যোক্তারা। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারলে শ্রম ও পুঁজির উৎপাদনশীলতা দুই-ই হ্রাস পায়। ফলে সামগ্রিকভাবে শিল্প ইউনিটের দক্ষতা কমে যায়। শিল্প সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশে সামগ্রিক পরিবেশের যে দুর্বলতা, এটা তা-ই নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন সমস্যা, কাঁচামাল সংকট, চাহিদা-সরবরাহে অসামঞ্জস্য, দক্ষ শ্রমিকসহ নানা কারণ থাকতে পারে। সব মিলে পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারার নেতিবাচক প্রভাবে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়। এর বিরূপ প্রভাব শ্রমিক-মালিক দুই পক্ষের ওপরই পড়ে।