শেষ পাতা

ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ

ক্ষতিগ্রস্ত হবে এক লাখ টন পাটপণ্য রফতানি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৩:৪০:০০ মিনিট, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রফতানিতে অ্যান্টিং-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। ফলে চলতি অর্থবছরেই রফতানিযোগ্য এক লাখ টন পাটপণ্য রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ)।

বিজেএমএ সূত্র জানায়, ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রতি টন পাটপণ্যে সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৩৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দিতে হবে। এতে চলতি অর্থবছরে ব্যাহত হতে পারে এক লাখ টন পাটপণ্য রফতানি। এর মধ্যে কিছু পাটপণ্য বর্তমানে রফতানির অপেক্ষায় দেশের স্থলবন্দরগুলোয় রয়েছে। আর কিছু ক্ষেত্রে এলসি খোলা হয়েছে এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন।

বাংলাদেশ জুট ডাইভারসিফায়েড প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মো. রাশেদুল করিম মুন্না এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ভারত মনগড়া তথ্যের ভিত্তিতে একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইনি কাঠামোর মধ্যে এ বিষয়ে সমাধান করতে গেলে এক-দুই বছর লেগে যেতে পারে। তত দিন ক্ষতির শিকার হবে পাটপণ্য রফতানি। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে রফতানি করা সম্ভব হবে না বিপুল পরিমাণ পাটপণ্য, যা উদ্যোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এখন কূটনৈতিক পথেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

জানা গেছে, পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। আর এতেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাটপণ্যে ভর্তুকির মাধ্যমে ডাম্পিংয়ের অভিযোগ তোলেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। পরে ২০১৪ সালে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে মামলা করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে সে সময় ভারতের পাট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (আইজেএমএ) পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের রফতানিকারকরা ভর্তুকি মূল্যে ভারতে পাট রফতানি করছেন। ফলে বাংলাদেশ থেকে আমদানিও অনেক বেড়েছে। এর প্রভাবে স্থানীয় শিল্প-সংশ্লিষ্টরা ব্যবসার ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পাচ্ছেন না।

তবে নগদ অর্থ সহায়তার মাধ্যমে ডাম্পিং হচ্ছে না বলে বরাবরই দাবি করে আসছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও ভারতের ব্যবসায়ীদের ডাম্পিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে, সরকার পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা দিচ্ছে সত্য, তবে তা দেয়া হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকেই। এতে মূল্য নির্ধারণে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি সহজ নয়।

বাংলাদেশের রফতানিকারকরা ভারতে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পাটপণ্য রফতানি করায় ২০১৪ সালে এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নেন দেশটির পাটপণ্য উৎপাদনকারীরা। তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়ার পর এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব অ্যান্টি-ডাম্পিং অ্যান্ড অ্যালাইড ডিউটিজ (ডিজিএডি)। প্রায় এক বছর ধরে তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে সংস্থাটি। এতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জানুয়ারি ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজস্ব বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশ ও নেপালের পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়া হয়। তবে দেশটির এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় ৯০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণেই ভারত একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে ডব্লিউটিওর কাছে আপিল করা হবে। আগামী রোববারের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করা হবে। আইনগত ব্যবস্থা ছাড়াও কূটনৈতিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বাজারে পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ানো ও রফতানি বাজার বহুমুখী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দুর্বল হওয়া এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরেই শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে এসেছে। ফলে বিষয়টি ভারত সরকার বিবেচনায় রাখবে। পাশাপাশি আগামী মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এ বিষয়ে একটি নোটশিট দেয়ার প্রচেষ্টা থাকবে। এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে।

জানা গেছে, ডাম্পিংয়ের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের কাছে বেশকিছু বিষয়ে জানতে চায় ভারত। এর মধ্যে ছিল— পাটপণ্যের রফতানিমূল্য, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতা, বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ প্রভৃতি। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা তদন্তে সহযোগিতা করেননি। আবার উত্তরগুলোতেও ছিল তথ্যের ঘাটতি। ফলে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কিছুটা একতরফা হয়েছে।

আর ভারতের এ সিদ্ধান্তে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পাটপণ্য রফতানিতে ধস নামার শঙ্কা করছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। এ বন্দর দিয়ে প্রতি বছর ভারতে প্রায় দুই লাখ টন পাটসুতা, বস্তা ও চট রফতানি করে আসছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে পাটসুতার পরিমাণ দেড় লাখ টনের বেশি। ব্যবসায়ীরা এত দিন প্রতি টন পাটসুতা ৮০০-৯০০ ডলারে রফতানি করে আসছিলেন। এখন এর সঙ্গে নতুন হারে শুল্ক যোগ হলে যে দাম দাঁড়াবে, তাতে ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।

পাটজাত পণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের প্রতিনিধি বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, গত সপ্তাহে তাদের প্রতিষ্ঠানের ২৯ টন পাটজাত পণ্যের একটি চালান রফতানি করতে শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়েছে ৮৫ হাজার রুপি। বর্তমানে ওই একই পরিমাণ পণ্য রফতানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ককর দিতে হবে ৩ লাখ ৭০ হাজার রুপি। এতে এখন আর কোনোভাবেই নতুন চালান রফতানি করা সম্ভব হবে না। আগে এলসি করা ছিল এমন কিছু পণ্য রফতানি হচ্ছে। দ্রুত বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।