শেষ পাতা

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের টানাপড়েন

হাছান আদনান | ২৩:৪০:০০ মিনিট, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

‘প্রবাসীদের জন্য ঝুঁকি ও শোষণমুক্ত সুন্দর পৃথিবী নিশ্চিত’ করার দর্শনে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নিজেই এখন ঝুঁকিতে। ব্যাংকটির মূলধন বাড়ানো নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চলছে টানাপড়েন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ব্যাংকটির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২৫০ কোটি টাকা মূলধন চাইলেও তা পায়নি। এ নিয়ে হতাশা বাড়ছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে।

১০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ছয় বছর আগে যাত্রা করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। প্রায় এক বছর আগে সিদ্ধান্ত হয়, ব্যাংকটিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ২৫০ কোটি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৫০ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেবে। একাধিক বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) জাবেদ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের বর্তমান কর্মকাণ্ড সন্তোষজনক নয়। ব্যাংকটিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তর করা প্রয়োজন। এটি করতে হলে ৪০০ কোটি টাকার মূলধন প্রয়োজন। এ টাকা দেয়ার সামর্থ্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেই। এজন্য ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়। কয়েক দফা বৈঠকের পর অর্থ মন্ত্রণালয় ২৫০ কোটি টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির শাখা ৫৪টিতে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে লোকসানে রয়েছে মাত্র একটি শাখা। ব্যাংকটির বর্তমানে জনবল ২৫৭ জন। এর মধ্যে ১০৮ জনই অস্থায়ী। যদিও ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের জনবল ছিল ২৭০ জন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি মুনাফা করেছে ৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ব্যাংকটির শাখাপ্রতি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ২৪১। প্রত্যেক গ্রাহক গড়ে ঋণ পেয়েছেন ৭৩ হাজার টাকা।

মাত্র ১০০ কোটি টাকার মূলধন নিয়ে প্রায় এক কোটি অভিবাসীর কল্যাণের চিন্তা করা বোকামি বলে মন্তব্য করেন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়াহিদুজ্জামান খন্দকার। তিনি বলেন, ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ও মূলধনের পরিমাণ বৃদ্ধি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। সরকার যদি মূলধনের জোগান বাড়ায়, তাহলে ব্যাংকের কার্যক্রম ভালোভাবে চালানো সম্ভব। তবে স্বল্প পুঁজি নিয়েও ব্যাংকটি সীমিত পরিসরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঋণ দিয়ে যাচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে মোট ২০ হাজার ১৮৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ঋণ নিয়েছেন। এদের মধ্যে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১৮৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আদায় করেছে ব্যাংকটি। যদিও অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশীদের ১ শতাংশও ঋণ পাচ্ছেন না প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে যোগদানের আগে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন মো. আতাউর রহমান প্রধান। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারে কোনো ব্যাংকের জন্য ১০০ কোটি টাকা কোনো মূলধনই নয়। দেশের বৃহত্ একটি জনগোষ্ঠীর মেধা, শ্রম ও জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অথচ সেই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর কিছু করতে পারছে না। পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হলে তবেই এটি প্রবাসীদের কল্যাণে আসবে।

বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে মূলধন জোগান দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানান তিনি।

ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৫ দশমিক ১০ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে মো. ওয়াহিদুজ্জামান খন্দকার বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ খুবই নগণ্য। অভিবাসী গ্রাহকরা যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করছেন। বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে যথাযথভাবে ব্যাংকটি পরিচালনা করা সম্ভব হলে দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।