টকিজ

না হচ্ছে রিয়েলিটি শো না ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান!

রুবেল পারভেজ | ২০:১১:০০ মিনিট, জানুয়ারি ০৯, ২০১৭

নাটকের বাইরে ম্যাগাজিন ও রিয়েলিটি শোয়ের মতো টেলিভিশন অনুষ্ঠানের প্রতি একটা সময় দর্শকের যে আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল, আজ কতটুকু তা বজায় রয়েছে? কিংবা প্রশ্নটা ঘুরিয়ে করে যায়— এখন বাংলাদেশের টেলিভিশনে আদৌ কোনো ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কি হয়, যা দর্শকরা দেখবেন? চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলা যায়, চট করে কাউকে কোনো ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কিংবা কোনো রিয়েলিটি শোর নাম বলতে বললে শত হাতড়ে, মাথা চুলকেও কোনো নাম বলতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে! খাঁটি দেশীয় ধ্যান-ধারণা ও পরিকল্পনায় এখন আর সত্যিকার অর্থেই কোনো অনুষ্ঠান নির্মাণ হয় না। চলচ্চিত্রের মতো টিভি অনুষ্ঠানমালায়ও পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আদলে ম্যাগাজিন কিংবা রিয়েলিটি শো বানানো হচ্ছে।

অথচ বাংলাদেশ টেলিভিশন তার জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে একটা  দীর্ঘ সময় বিষয়ভিত্তিক নানা অনুষ্ঠান উপহার দিয়ে এ দেশের দর্শককে মুগ্ধ করে রেখেছিল। গোড়াতেই নাম করা য়ায়: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উপস্থাপনায় ‘সপ্তবর্ণ’ ও ‘চতুরঙ্গ’, এর পর ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’, আনিসুল হকের (বর্তমানে ঢাকা উত্তরের মেয়র) ‘অন্তরালে’ ও ‘আনন্দমেলা’ ছাড়াও মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট শো, সিনেমার গান নিয়ে সাপ্তাহিক আয়োজন ছায়াছন্দ, শিশুদের নিয়ে নতুন কুঁড়ি, ফেরদৌসী রহমানের ‘এসো গান শিখি’, লায়লা হাসানের উপস্থাপনায় নৃত্যের তালে তালের ব্যাপক জনপ্রিয় সব অনুষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। আর আজকের টিভির তারকা খ্যাতি পাওয়া অনেক শিল্পী (তারিন, ঈশিতা, শাওন, মিম— এ রকম অনেকেই) বিটিভির নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠান থেকে দর্শক পরিচিতি পেয়েছেন।

মোটামুটি ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত এককভাবে বিটিভির কল্যাণে এ অনুষ্ঠানগুলোর নিজস্বতা বজায় ছিল। এর পর বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল আবির্ভাবের কারণে এটি যতটা না বিস্তৃত ও সম্ভাবনাময় বিনোদনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠার কথা ছিল, সেটি না হয়ে উল্টোটি হয়েছে, দেশে অনেক নতুন নতুন টিভি চ্যানেল হয়েছে, কিন্তু নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতা অনুষ্ঠান নির্মাণের দিকে কারোরই তেমন আগ্রহ নেই। সবাই শর্টকাট পথে হাঁটছেন। পাশের দেশের অনুষ্ঠানের নিম্নমানের অনুকরণ।

উদাহরণ হিসেবে গত কয়েক বছরে নির্মিত কয়েকটি অনুষ্ঠানের কথা স্মরণ করা যাক, ‘কে হতে চায় কোটিপতি’ রিয়েলিটি শোয়ের নির্মাণ প্রক্রিয়া এমনকি লোগো পর্যন্ত ভারতের রিয়েলিটি শো ‘কৌন বনেগা ক্রোরপতি’র নকল। আর ভারত এটি ‘আমদানি’ করেছিল ইংল্যান্ডের ‘হু ওয়ান্টস টু বি এ মিলিয়নেয়ার’ রিয়েলিটি শো থেকে। রান্না-বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘সুপার শেফ’, এটি ভারতের ‘মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’ নামে প্রচারিত হয় আর ভারত এটি কপি করেছে আমেরিকা থেকে, মাস্টারশেফ আমেরিকা, মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মাস্টারশেফ অনুষ্ঠান থেকে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নাদিয়া সেরার পুরস্কারও জেতেন— এগুলোর বাংলাদেশী সংস্করণ সুপার শেফ অনুষ্ঠানটি। এটি অস্ট্রেলিয়ান মাস্টারশেফ ও আমেরিকান মাস্টারশেফ অনুষ্ঠানের মতো করেই নির্মাণ করা হয়। এখানে অস্ট্রেলিয়ান ও আমেরিকান মাস্টারশেফ বিজয়ীদের আমন্ত্রণও জানানো হয়। এবং বিজয়ী নির্বাচনেও তারা ভূমিকা রাখেন। এত কিছুর পরও এসব কপি অনুষ্ঠান এ দেশে দর্শকপ্রিয়তা পায়নি।

গানের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও মাঝে মধ্যে এমন অনুকরণ প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। এর মধ্যে একেবারে নাম, লোগো ও বিজয়ী নির্বাচনের প্রক্রিয়ার দিক থেকে সবার সামনে চলে আসে ‘বাংলাদেশ আইডল’ অনুষ্ঠানটি। এটিও আমেরিকান আইডল ভায়া ইন্ডিয়ান আইডলের বাংলা সংস্করণ। আমেরিকা, ভারতে এটি ব্যাপক দর্শক টানতে পারলেও বাংলাদেশে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ম্যাগাজিনের কথা বলতে গেলে এখন পর্যন্ত ‘ইত্যাদি’ ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানই দাঁড়াতে পারেনি। যদিও এটি একই ধাঁচের অনুষ্ঠান নির্মাণ কৌশল থেকে বের হতে না পারায়, তার যে বিশাল সংখ্যক দর্শক ছিল, তা হারাতে বসেছে। ম্যাগাজিন নিয়ে দেশের এ পরিস্থিতিতেই ভারতের কমেডি শো ‘মীরাক্কেল’-এর আদলে তৈরি হয়েছে ‘হা শো’ নামের একটি অনুষ্ঠান। উপস্থাপক নিয়ে বিতর্ক, বিষয়বৈচিত্র্যসহ বিভিন্ন কারণে এটিও এখন দর্শকশূন্য।

নাটকের বাইরে নির্মিত এসব অনুষ্ঠান নিয়ে কেন এমন পরিস্থিতি, তা জানতে টকিজ যোগাযোগ করেছিল গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও শিক্ষক সুমন রহমানের সঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে তিনি জানান, বর্তমান সময়ে টেলিভিশন একটি অনুষ্ঠান বানাবে আর দর্শক শুধু নিষ্ক্রিয়ভাবে তা দেখবেন, তা নয়। এ কারণেই সারা পৃথিবীতে রিয়েলিটি প্রোগ্রামগুলোর আধিক্য বাড়ছে। এখন ধরা হয়, দর্শক কেবল দর্শক নন, তিন প্রোগ্রামেরই অংশ।

এসব অনুষ্ঠান দেশে সফল না হওয়ার কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। তার মধ্যে রয়েছে— একটি অনুষ্ঠান সব সময় একই ফরম্যাটে চললে তা দর্শকের কাছে একঘেয়েমি হয়ে যায়। এজন্য বারবার ফরম্যাটে পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া রয়েছে— অনুষ্ঠান গবেষণার কথা। যে অনুষ্ঠান যত বেশি গবেষণা করবে, সেটি তত বেশি দর্শক ধরে রাখতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে সুমন রহমান বলেন, ‘আমির খান উপস্থাপিত ওই অনুষ্ঠান এত বেশি জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ, একটি অনুষ্ঠান নিয়ে যত বেশি গবেষণা হবে, সেটি তত বেশিই সফল হবে। উপস্থাপক, বাজেট, দর্শক কোন বিষয়টি পছন্দ করছেন, সেগুলোর প্রতিও খেয়াল রাখা জরুরি।