ফিচার

ট্রাম্পের মহাপ্রাচীর বনাম চীনের মহাপ্রাচীর

বণিক বার্তা অনলাইন | ১৭:৩৪:০০ মিনিট, জানুয়ারি ০৮, ২০১৭

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময়ই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে একটি ‘মহাপ্রাচীর’ নির্মাণ করবেন তিনি। নির্বাচিতও হয়েছেন। আগামী ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউজে পদার্পণ করবেন নবনির্বাচিত এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এরই মধ্যে তার সেই মহাপ্রাচীরের খরচ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এই প্রকল্পে অর্থ খরচ করতে অনিচ্ছুক তার নিজ দল রিপাবলিকান সদস্যরা।

তবে পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে রাজি নন তিনি। ওই প্রকল্পে অর্থায়নে সহায়তার জন্য ইতিমধ্যে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের আহ্বানও জানিয়েছেন। শুক্রবার এক টুইটার বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘যারা ওই মহাপ্রাচীর নির্মাণে অর্থ ব্যয় করবে তাদের সম্পূর্ণ অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ করা হবে।’

এদিকে তার ওই ‘মহাপ্রচীর’ শব্দের ব্যবহার আমাদের সামনে আরেকটি মহাপ্রাচীরের চিত্র তুলে ধরে- সেটি হচ্ছে চীনের মহাপ্রাচীর। তবে দুই মহাপ্রাচীরের পার্থক্যটাও ভুলে যাননি ট্রাম্প। এ নিয়ে ফক্স নিউজের বিল ও’রেইলিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চীনের ওই মহাপ্রাচীরের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রেরটা একেবারেই সাধারণ। ২০১৫ সালেও চীনের ১৩ হাজার মাইলব্যাপী মহাপ্রাচীরের তুলনায় মেক্সিকো সীমান্তে নির্মিত হতে যাওয়া প্রাচীরকে ‘চীনেবাদাম’ বলেছিলেন এই রিয়েল এস্টেট মোগল।

প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্পের কথিত মহাপ্রাচীরের সঙ্গে চীনের মহাপ্রাচীরের পার্থক্য কতখানি?

চীন সরকারের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান মতে, তাদের ১৩ হাজার মাইলের বেশি ওই প্রাচীরটির বিস্তৃতি ১৫টি প্রদেশ, স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য এবং পৌরসভাজুড়ে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত প্রাচীর স্পর্শ করবে দেশটির চারটি অঙ্গরাজ্য- ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা, নিউ ম্যাক্সিকো এবং টেক্সাস। এ পর্যন্ত ৭০০ মাইল বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে। এর বাইরে খোলা রয়েছে আরো ১ হাজার ২০০ মাইল।

চীনের মহাপ্রাচীর একক কোনো রাজবংশ বা গোষ্ঠির চেষ্টায় হয়নি। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রাজবংশ প্রাচীরটি নির্মাণে নানা পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছেন। পদ্ধতিগুলোর বেশিরভাগই ছিল বিপজ্জনক। দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং ক্লান্তিতে মারা গেছেন অনেক শ্রমিক, পরবর্তীতে যাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মহাপ্রাচীর নির্মাণের কাজে শুরুতে নিয়মিত সৈন্যদের নিয়োগ দিত রাজারা। তবে শেষের দিকে এই প্রাচীর তৈরিতে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী আর ভাড়াটে সৈনিকদের ভূমিকাই ছিল বেশি।চীনের মহাপ্রাচীরকিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীরটি কীভাবে নির্মাণ করা হবে তার কোনো পরিকল্পনা এখনো দিতে পারেননি ট্রাম্প। ইতিমধ্যে কাজ পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে অনেকগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে ইসরায়েল সীমান্তে বেড়া নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটিও রয়েছে।

কাজ শুরুর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত হলে মেক্সিকো সীমান্তের ওই প্রাচীর নির্মাণের জন্য দরকার হবে অন্তত তিনটি রাষ্ট্রপতিত্বকাল। আর চীনের মহাপ্রাচীর নির্মাণে অতিক্রান্ত হয়েছে কয়েক ডজন শাসক। শতাব্দীব্যাপী এই সময়ে চীনা রাজবংশে ঘটেছে নানা উত্থান-পতন।

২২১ খ্রিস্টপূর্বে কিন বংশের প্রথম রাজা চীনকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তখনই রাজ্যসীমানায় নির্মিত পুরনো সব প্রাচীর ভেঙে ফেলে রাষ্ট্রীয় সীমানায় একটি প্রাচীর তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। উত্তরাঞ্চলীয় যাযাবর উপজাতি থেকে দেশকে রক্ষার জন্যই কাজটি শুরু করেন রাজা। কয়েক শতক ধরে নির্মাণকাজ চলার পর এটি বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। পরে মিং রাজবংশের শাসনামলে (১৩৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রাচীরটি আরো ৫ হাজার মাইল বাড়ানো হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনাটি কংগ্রেস অনুমোদন করেছিল ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়। তখনই এটি আইনে পরিণত হয়। এখন পর্যন্ত মেক্সিকোর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে ৭০০ মাইল বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।

কয়েক শতক ধরে চীনের মহাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল: যাযাবর উপজাতি, মঙ্গলীয় আক্রমণকারী এবং রাজনৈতিক শত্রুদের থেকে নিজেদের ভূখণ্ড এবং সংস্কৃতি রক্ষা করা। মঙ্গল ইউয়ান রাজবংশের সময়ে তেরো শতকে প্রথম চেঙ্গিস খান তাদের মহাপ্রাচীরকে নিরাপত্তা ফাঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতেন। বিদ্রোহী দমনেও ব্যবহার করা হতো এটি।অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ ট্রাম্পের নির্বাচনী ঘোষণাঅবশ্য ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ভিন্ন। সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের পেছনে তার লক্ষ্য হচ্ছে, মেক্সিকো থেকে অবৈধ অভিবাসী এবং মাদক চোরাচালান ঠেকানো। যদিও ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকো থেকে আগত অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

সূত্র: সিএনএন