ড. বদিউল আলম মজুমদার, ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিনি কুমিল্লা বার্ডের বোর্ড অব গভর্নর্সের, টিআইবির উপদেষ্টা পরিষদের এবং ডেনমার্ক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘হাইসাওয়া ফান্ড কোম্পানি’-এর বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য ছিলেন। তিনি জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার ও নির্বাচন কমিশনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
নির্বাচনী ব্যবস্থা ও কাঠামো সংস্কার নিয়ে কথা হচ্ছে। আপনি নির্বাচন কমিশন সংস্কারের দায়িত্বে আছেন। সংস্কার নিয়ে কী ভাবছেন?
দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্র, সুশাসন ও নির্বাচন নিয়ে কাজ করছি। আমাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যে নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা। যাতে এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রা আরো বেগবান ও সফল হতে পারে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বিভিন্ন আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের পর্যালোচনা করা, অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা, দেশের অতীত অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করাই আমাদের দায়িত্ব।
দেশের বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক আছে। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন পেতে হলে সংস্কারের জন্য কী ধরনের প্রস্তাব আনতে পারেন?
আগের নির্বাচন কমিশনের গঠন ও নিয়োগ যে প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে তা সঠিক ছিল না। দেশে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য কোনো আইন ছিল না। সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিত। তবে কমিশন নিয়োগের আগে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হতো। এ কমিটিতে যাদের নিয়োগ দেয়া হতো তারা সরকারের অনুগত ছিলেন। অর্থাৎ সরকার যাদের চাইত তারাই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পেতেন। ফলে গত দুটি নির্বাচন কমিশনে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা শুধু সরকারে অনুগতই নন, বরং তাদের সরকার বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছে। এটি যাতে পুনরায় না হয় সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হবে।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন গঠন ও নিয়োগের জন্য একটি আইন করা হবে। সে আইনের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও সেই আইন করা হয়নি। তবে আমরা আইন তৈরির জন্য আলোচনা করছি। ২০২২ সালে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের আইনের একটি খসড়া করেছিলাম এবং সেটি তৎকালীন সরকারকে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিগত সরকার এ বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। নির্বাচন কমিশন নিয়ে জনমত সৃষ্টি হলে সরকার নিজেই একটি আইন করেছিল। আগে যে প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিত সেটাকেই তারা দায়মুক্তির বিধান যুক্ত করে আইনে পরিণত করেছিল। বিগত সরকারের করা আইনটি ত্রুটিপূর্ণ আইন ছিল বলে মনে করি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে যাতে নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায় সেজন্য আমরা একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছি, যা এরই মধ্যে আমরা সরকারের সঙ্গে শেয়ার করেছি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন যখন দেব তখন সেখানেও এটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের।
নতুন সংবিধান প্রণয়নের আলোচনা জোরেশোরে হচ্ছে। আবার একটা অংশ পুরনো সংবিধানেই আস্থা রাখার পক্ষে। বিদ্যমান সংবিধান দিয়ে আমরা শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন পেতে পারি কি?
বিদ্যমান সংবিধানে কিছু সমস্যা রয়েছে। সংবিধানে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত আছে, সেখানে আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। তবে সংবিধানে যেসব বিষয় আছে সেগুলোও সঠিকভাবে মানা হয় না। যেমন সংবিধানে বলা আছে, নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের সব কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করবে সরকার। প্রকৃতপক্ষে তা করা হয় না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে সরকার। আবার সরকার তার পছন্দের ব্যক্তিদের উচ্চ পদে নিয়োগ দিয়ে নিজেদের পক্ষে ফল নিয়েছে। সচিব থেকে শুরু করে কমিশনার এমনভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে যারা ক্ষমতাসীন সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন।
সংবিধানে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। তবে আমাদের সবচেয়ে সমস্যা ছিল প্রয়োগে। সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি একাগ্রতা ও অঙ্গীকারেরও অভাব ছিল। মনে রাখতে হবে অতীতে নির্বাচন কমিশন ছাড়াও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়েছিল এবং সে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ছিল। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নির্বাচনী সংস্কৃতি, আন্তরিকতা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইনি বিধি-বিধান নিঃসন্দেহে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আইনি বিধি-বিধানগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম হবে। তবে রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর আর্থিক সমৃদ্ধি হয়, তাহলে কোনো সংস্কারই কাজে লাগবে না। তাই রাজনীতির উদ্দেশ্যে রূপান্তর ঘটাতে হবে । রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থান একটি ম্যান্ডেট, যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। সেদিকে আমরা কীভাবে এগোচ্ছি?
গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি বিষয় সুস্পষ্ট। জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে যারা নির্বাচিত হবেন তারা যেন সরকার গঠন করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। আর একই সঙ্গে যারা গণহত্যা, অপরাধ করেছে এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা। এ সংস্কারের উদ্দেশ্যই হচ্ছে অতীতের অপকর্মগুলোর পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
নির্বাচন কমিশন সংস্কারের অগ্রগতি জানতে চাই।
এরই মধ্যে আমাদের নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের ১৫-১৬টি আনুষ্ঠানিক সভা হয়েছে। এছাড়া অংশীজনদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। সামনে অংশীজনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবেও আলোচনা করব। আমরা গণতান্ত্রিক উত্তরণ চাই। সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনেও পরিবর্তন আনা হবে। আমরা চাই, জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সংসদ গঠন করা হবে। তারা জনগণের কল্যাণে ও স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কিন্তু এটি করতে প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানে যেসব সমস্যা আছে এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার পরিধি ও প্রয়োগে সমস্যা আছে সেগুলো সংশোধন করতে হবে। বিধি-বিধানে কিছু কিছু ত্রুটি আছে। এসব নিয়ে আমরা আলোকপাত করছি। এগুলো পরিবর্তনের জন্য অভিজ্ঞতার আলোকে সুপারিশমালা পেশ করা হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন? তারা কী বলছে?
দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর লিখিত সংস্কার প্রস্তাব আমরা সংগ্রহ করছি। তাদের প্রস্তাবগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। সামনেও আরো আলোচনা হবে। সংস্কার কমিশনের কাজ মূলত টেকনিক্যাল। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করার এখতিয়ার সংস্কার কমিশনের নেই। রাজনৈতিক দলসহ অন্যদের মতামত নিয়ে সংস্কার কমিশন একটি সুপারিশমালা তৈরি করবে। সুপারিশমালা তৈরি করাই সংস্কার কমিশনের কাজ। সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের সঙ্গে রাজনীতিকসহ অন্যান্য অংশীজনের সংলাপ হবে। সরকারের সঙ্গে সংলাপ হয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছে নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করবে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ এর পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন। আপনারা এটিকে কীভাবে দেখছেন?
বিভিন্ন অংশীজন ও বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে যারাই আগ্রহী তারাই এ বিষয়ে মতামত দিতে পারবেন। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক অভিমত আছে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা আছে। এ বিষয়ে মূল সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংবিধান সংশোধনের জন্য যে কমিশন কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের। আমরা তাদের সঙ্গেও কাজ করব। আমরা কোনো বদ্ধমূল ধারণার ভিত্তিতে অগ্রসর হচ্ছি না। সবার মতামত বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সুপারিশ প্রণয়ন করব।
অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাষ্ট্র মেরামতের ম্যান্ডেট পেয়েছে। নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দেয়ার সময় এসেছে—এটি আমরা কখন মনে করব?
এ সরকার ক্ষমতার পাহারাদার। এ সরকারের কাজ হবে কতগুলো পরিবর্তন এনে এবং মাঠ পরিচ্ছন্ন করে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট নেই তাদের। সংস্কার করতে যতটুকু সময় প্রয়োজন সেই সময়টুকুই নেয়া প্রয়োজন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ যাতে মসৃণ ও পরিশীলিত হয় সেজন্য কতগুলো পরিবর্তন এনে নির্বাচন দিয়ে তারা তাদের অবস্থানে ফিরে যাবে। এর ফলে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল বা দলগুলো ক্ষমতায় আসবে। সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে তাদের ঘাড়ে। ক্ষেত্রটা পরিচ্ছন্ন করা ও একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। আমি নিশ্চিত তারা এ কাজটাই করার চেষ্টা করছেন।
শ্রুতলিখন: দিদারুল হক